গ্রাফাইটিস (Graphites)

গ্রাফাইটিস একটি এন্টিসোরিক ঔষধ। দেখতে বলবান , মাংস থলথলে, সর্বদা বিমর্ষ , দুঃখিত।
মনে অমঙ্গলের আশঙ্কা করে, এজন্য সর্বদা উদ্বিগ্ন। মরণের বিষয় ভাবে।
কিছুই মনে থাকেনা , সবকিছু ভুলিয়া যায়। শীত বোধ করে, সহজেই ঠান্ডা লাগে।
এক প্রকার মুদ্রাদোষ -কোনো কার্যে নিযুক্ত থাকিলেও হাত -পা নাচায়।
পুরুষ সহবাসে অনিচ্ছা ,ঋতু বিলম্বে প্রকাশিত হয়, —-এসব পীড়ায় গ্রাফাইটিস উপযোগী।
সাধারণত গ্রাফাইটিস ধাতুর ৩টি F- Fair, Fatty & Flabby .
চরিত্রগত লক্ষণ :
১. চর্ম পীড়া -ফাটাফাটা দেখতে কাউরে ঘায়ের মতো, তাহাতে চটচটে রস নির্গত হয়।
চোখের পাতায় একজিমা – পাতা লালবর্ন, পাতার ধারগুলিতে মাছের আঁশের মোতো পদার্থ জমা হয় অথবা মামড়ি পড়ে।
২. অতিরিক্ত রতিক্রিয়া অথবা শুক্র ক্ষয়ের নিমিত্ত জননেন্দ্রিয়ের দুর্বলতা।
৩. মাথার উপর কোনো গোলাকার স্থানে জ্বালা।
৪. গায়ের চামড়া দেখতে অস্বাস্থকর, প্রত্যেক আহত স্থান পাকে, পুঁজ হয়, পুরাতন ক্ষতও পুনরায় পাকে।
৫. হাত-পায়ের আঙুলের নখের বিকৃতি ও নখ কোঁকড়াইয়া যায়, পুরু ও মোটা হয়, ঘা হয়।
৬. স্তনের ফোড়া আরোগ্য হবার পর শক্ত ভাব ও ক্ষতের দাগ থাকে, পুনরায় উহার প্রদাহ হয়, এইরূপ পুনঃ পুনঃ ক্ষত হয়ে ক্যান্সারে পরিণত হয়। স্তন হতে দুগ্ধ নিঃসৃত হয়না।
৭. ঋতুর পূর্বে ও পরে প্রদরস্রাব, হাজাকারক স্রাব নির্গত হয়।
৮. কোষ্ঠকাঠিন্য -মল খুব শক্ত,গাঁট-গাঁট, বড়, তার সাথে আম জড়িত, অতি কষ্টে নির্গত হয়, বাহ্যের পর মলদ্বারে ক্ষতের মত টানাটানি -বেদনা।
৯. স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই রতিক্রিয়ায় অনিচ্ছা।
১০. মুখের ইরিসিপেলাস, তাহাতে জ্বালা ও হুলফোটা বেদনা, পীড়ার গতি ডানদিক থেকে আরম্ভ হয়ে বামদিকে যায়।
গ্রাফাইটিসের – আলোচনা
অন্যান্য কার্বন জাতীয় ঔষধের মত, এটিও একটি ব্যাপক শক্তিশালী (সোরা দোষ নাশক ঔষধ) ।
বিশেষভাবে সেই সকল রোগ সমূহের উপর বিশেষভাবে কাজ করে যারা মোটা ধরণের, গায়ের রঙ ফর্সা । চর্মরোগ ও কোষ্ঠকাঠিণ্যের প্রবণতাযুক্ত, মেদবহুল, শীতকাতুরে ও কোষ্ঠবদ্ধতা যুক্ত, তৎসহ যাদের মাসিক ঋতুস্রাব নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে দেখা দেয়।
খুব সহজেই ঠান্ডা লাগে। শিশুরা নির্লজ্জ, বেহায়া প্রকৃতির, বকাবকি করলেও হাসতে থাকে।
মন — হঠাৎ করে চমকিয়ে উঠার প্রবণতা। ভীরু। কোন কিছু সিদ্ধান্ত করতে পারে না। কাজ করার ইচ্ছার অভাব। বসে কাজ করার সময় অস্থিরতা ও চঞ্চলতা। গানবাজনা শুনলে কান্না পায়। আতঙ্কগ্রস্ত স্বভাব, হতাশা, ও সিদ্ধান্ত করতে অক্ষম।
মাথা — মস্তিষ্কের রক্তাধিক্য তৎসহ মুখমন্ডল রক্তিমাভ তৎসহ নাক দিয়ে রক্তস্রাব এবং উদর স্ফীতি পেটে বায়ুসঞ্চয়। সকালে ঘুম থেকে উঠার পরে মাথার যন্ত্রনা, বিশেষভাবে মাথার একদিকে, তৎসহবমি করার প্রবণতাযুক্ত।
কপালের উপর মাকড়সার জালের মত অনুভূতি। অসাড়তার অনুভূতি। মাথার একদিকে বাতজনিত বেদনা, বেদনা দাঁত ও ঘাড় পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মাথার তালুতে জ্বালাবোধ। মাথার চামড়ার চুলযুক্ত অংশে আর্দ্র ও চুলকানিযুক্ত উদ্ভেদ, উদ্ভেদগুলি থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরিয়ে থাকে।
চোখ – চোখ উঠা, তৎসহ কৃত্রিম আলোক সহ্য হয় না। চোখের পাতাদ্বয় লালচে ও স্ফীত। অক্ষিপুট প্রদাহ। চোখের পাতার শুষ্কতা। চোখের পাতায় একজিমা। ফাটাযুক্ত।
কান – কানের ভিতরের অংশের শুষ্কতা। আহারের সময় কানের ভিতর কটকটু করে শব্দ হয়। কানের পিছনের অংশে ভিজাভাব ও উদ্ভেদসমূহ। গোলযোগের ভিতর ভালো শুনতে পায়। ভাল শুনতে পায় না।
কানের ভিতর হুস হুস্ শব্দ। কানের ভিতর বন্দুকের শব্দ শুনতে পায়। কানের ভিতরের পর্দার উপর পাতলা, সাদারঙের আঁশের মত আবরণ। কানের ভিতরে ও বাইরে ফাটা।
নাক – নাক ঝাড়ার সময় টাটানি ব্যথা; ভিতরের অংশ বেদনাদায়ক; ঘ্রান শক্তি অস্বাভাবিক রকমের তীব্র নাসিকা ছিদ্রে মামড়ি ও ফাটা সমূহ।
মুখমন্ডল — মনে হয় মুখের উপর মাকড়সার জাল জড়িয়ে রয়েছে। নাকে একজিমা। চুলকানিযুক্ত ফুস্কুড়িসমূহ। মুখগহ্বর ও চিবুকের চারিপাশে আর্দ্র প্রকৃতির একজিমা। ইরিসিপেলাস, জ্বালা ও হুল ফোটার মত বেদনাযুক্ত।
মুখগহ্বর – মুখগহ্বর থেকে পচাগন্ধ বেরিয়ে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসে প্রস্রাবের মত গন্ধ। জিহ্বার উপর জ্বালাকর ফোস্কাসমূহ, লালাস্রাব, টক ঢেকুর।
পাকস্থলী – মাংসের অনিচ্ছা। মিষ্টি খাবারে বমি আসে। গরম পানীয় অপচ্ছন্দ। প্রতিবার আহারের পরে বমি-বমিভাব ও বমি। ঋতুকালে সকালে বমি-বমি ভাব। পাকস্থলীতে চাপবোধ। পাকস্থলীর ভিতর জ্বালা করে, এর ফলে ক্ষুধাপায়। ঢেকুর তুলতে কষ্ট হয়। পাকস্থলীর ভিতর সঙ্কোচনের অনুভূতি। পুনঃ পুনঃ পাকস্থলীর শূলবেদনা। বায়ুসঞ্চয়। পাকস্থলীর বেদনা আহারে, গরম পানীয় বিশেষ করে গরম দুধে ও শুয়ে পড়লে সাময়িকভাবে উপশম হয়।
উদর – পেটের বমি হবারমত অনুভূতি। পেটের ভিতর পূর্ণতার ও কঠিনতার অনুভূতি, যেন মনে হয় পেটের ভিতর কোন স্থানে বায়ু জমে রয়েছে; পরা জামাকাপড় ঢিলা করতে বাধ্য হয়; পেটের গোলাকার অংশে বায়ুবেদনাদায়ক ভাবে চাপ দেয়। পেটের ভিতর কন্কন শব্দ হয়। কুঁচকি স্থান অনুভূতিপ্রবণ, স্ফীত। রোগী যেদিক চেপে শুয়ে থাকে, তার বিপরীত দিকে বায়ু জমে বেদনা হয়। পুরাতন উদরাময়, মল বাদামীবর্ণের, তরল, অভুক্ত খাদ্যবস্তু যুক্ত, দূর্গন্ধযুক্ত। তীব্র, দুর্গন্ধযুক্ত বায়ু নির্গমন হয়। বায়ু নির্গমনের পূর্বে শূলবেদনা।
মল — কোষ্ঠকাঠিণ্য, মলবৃহৎ, কষ্টকর, গুটলে প্রকৃতির, যা শ্লেষ্মাদ্বারা সংযুক্ত থাকে। জ্বালাকর অর্শ। সরলান্ত্রের স্থানচ্যুতি, উদরাময়; বাদামী বর্ণের তরল মল, মলের সঙ্গে অভুক্ত খাদ্যবস্তু মিশ্রিত থাকে, তীব্র, দূর্গন্ধযুক্ত, টক গন্ধ। মলত্যাগের সময় মলদ্বারে বেদনা, টাটানি ব্যথা ও চুলকায়। পিন্ডের মত মল, শ্লেষ্মা সূতা দিয়ে সংযুক্ত থাকে। সরলান্ত্রের শিরা স্ফীতি। মলদ্বারে ফাটা।
প্রস্রাব – ঘোলাটে, তৎসহ তলানি থাকে। টকগন্ধযুক্ত।
স্ত্রীরোগ — মাসিক ঋতুস্রাব অত্যন্ত দেরী করে, তৎসহ কোষ্ঠকাঠিণ্য; ফ্যাকাশে ও অল্প তৎসহ পেটের উপরের অংশে ছিঁড়ে ফেলার মত বেদনা এবং ঋতুস্রাবের আগে চুলকানি। ঋতুস্রাবকালে কাশি, সর্দি, স্বরভঙ্গ, ঘাম ও সকালে বমি বমিভাব দেখা দেয়। প্রদরস্রাব, ফ্যাকাশে, পাতলা, প্রচুর, সাদাবর্ণের,হাজার তৎসহ পিঠের দুর্বলতা। স্তনগ্রন্থি স্ফীত ও কঠিন। ডিম্বাশয়, জরায়ু ও স্তনগ্রন্থির কঠিনতা। স্তনের বোঁটায় ক্ষত, ফাটাফাটা, ও ফোস্কাযুক্ত। সঙ্গমে বিরক্তি।
পুরুষের রোগ – যৌনক্রিয়া বিষয়ে দুর্বলতা তৎসহ কামেচ্ছার বৃদ্ধি; সঙ্গমে অনিচ্ছা, শীঘ্র-শীঘ্র বীর্যস্খলন অথবা মোটেও বীর্যনির্গত হয় না; যৌনাঙ্গে হার্পিসের মত উদ্ভেদ।
শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রসমূহ – বুকের ভিতর সঙ্কোচনের অনুভূতি; আক্ষেপিক হাঁপানী, শ্বাসরুদ্ধ করার ন্যায় রোগাক্রমণ, রোগী ঘুম থেকে জেগে উঠে; অবশ্যই কিছু আহার করতে হয়। বুকের মাঝখানে বেদনা, তৎসহ কাশি, চেঁচে ফেলার মত অনুভূতি ও টাটানি ব্যথা। পুরাতন স্বরভঙ্গ তৎসহ চামড়ার উপসর্গ সমূহ। স্বরযন্ত্রের কাজ নিজের আয়ত্তের বাইরে; গান করার আগে স্বরভঙ্গ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ – ঘাড়ে, কাঁধে, পিঠে ও অঙ্গ সমূহ বেদনা। কশেরুকার বেদনা। কোমরে বেদনা তৎসহ প্রচন্ড দুর্বলতা। দুটি ঊরুস্থানের মধ্যবর্তীঅংশ হেজে যায়। বামহাতের অসাড়তা; বাহু যেন ঘুমিয়ে রয়েছে এই জাতীয় অনুভূতি; হাতের আঙ্গুলের নখগুলি পুরা, কালো ও খসখসে। নখের নিচের অংশ প্রদাহিত। নিম্নাঙ্গের শোথ। পায়ের আঙ্গুলের নখগুলি বিকৃত। পায়ের আঙ্গুলের আড়ষ্টতা ও সঙ্কোচন। নখগুলি ভঙ্গুর। নখগুলির বিকৃতিগঠন, বেদনাদায়ক টাটানি ব্যথা, পুরু ও খর্বাকৃতি। আঙ্গুলের প্রান্তভাগ ফাটা। পায়ে দূর্গন্ধযুক্ত ঘাম।
চামড়া – খসখসে শক্ত, চামড়ার যে অংশে একজিমা হয় না ঐ অংশ সর্বদা শুষ্ক থাকে। কিলয়েড ও ফাইব্রয়েডের প্রাথমিক দশা। ফুস্কুড়ি ও ব্রন। উক্তেসমূহ, চটচটে রস গড়িয়ে আসে। অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভাঁজ হওয়া স্থান, কুঁচকির ভাঁজে, ঘাড়ের ভাঁজে ও কানের পিছনের অংশ হেজে যায়। অস্বাস্থ্যকর চামড়া; সামান্য আঘাতে পুজোঁৎপত্তি। ক্ষতস্থান থেকে আঠারমত রস বেরিয়ে থাকে, রস পাতলা ও চটচটে। গ্রন্থিসমূহের স্ফীতি ও কঠিণতা। গেঁটে বাতজনিত গুটি সমূহ। স্তনের বোঁটা, মুখগহ্বরে, পায়ের দুটি আঙ্গুল মধ্যবর্তীস্থান, ও মলদ্বারে ফাটা সমূহ। মুখমন্ডলের ইরিসিপেলাস; জ্বালাকর ও হুলফোটার মত বেদনা। পায়ের পাতার স্ফীতি। চামড়ার স্থায়ী স্ফীতি সমূহ। রাসটক্সের পুরাতন বিষ ক্রিয়া।
বৃদ্ধি- উষ্ণতায়, রাত্রে, ঋতুকালে ও ঋতুকালের পরে।
উপশম — অন্ধকারে, আবৃত অবস্থায় থাকলে।
সম্বন্ধ – পরিপূরক, আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম, (পাকাশয়িক গোলযোগে এই ঔষধের পরে ভালো কাজ করে), কষ্টিকাম, হিপার সালফ; লাইকোপোডিয়াম; আর্সেনিক; টিউবারকিউলিনাম।
লাইকো, পালসের পর এ ওষুধ ভালো কাজ করে, অল্পবয়সী মহিলাদের মোটা হওয়া রোগে প্রচুর পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর মেদযুক্ত তন্তু হতে থাকলে, ক্যালকেরিয়ার এ পর ওষুধ ব্যবহার্য। চর্মরোগে সালফের পর ও বেগে শ্বেত প্রদর বার হতে থাকা লক্ষণে সিপিয়ার পর গ্রাফাইটিস ভালো কাজ করে । ঋতু সম্বন্ধীয় রোগে লাইকো ও পালসের সমগুণ ।
শক্তি — ৩০, ২০০ হতে উচ্চশক্তি ।
বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।
( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )