Bryonia Alba (ব্রায়োনিয়া আলবা)
ব্রায়োনিয়া আলবা হোমিওপ্যাথিক ওষুধটি কিউকারবিটেসী নামে একটি উদ্ভিদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি অ্যান্টিরিউমেটিক এবং অ্যান্টিসাইকোটিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত।
ব্রায়োনিয়া নানা জাতের, তার মধ্যে হ্যানিম্যান কেবল ব্রায়োনিয়া অ্যালবার আময়িক গুণই পরীক্ষা করেছিলেন। ব্রায়োনিয়ার সরস মূল থেকেই মাদার টিংচার তৈরী করা হয়।
ব্রায়োনিয়া আলবার চরিত্রগত লক্ষণ:-
প্রাথমিকভাবে প্রদাহ, সেলাইয়ের ব্যথা এবং নড়াচড়া থেকে উত্তেজনা সম্পর্কিত শারীরিক লক্ষণগুলির সাথে যুক্ত।
- যারা নড়াচড়া থেকে উত্তেজনা, স্থির থাকার আকাঙ্ক্ষা।
- একাকীত্ব পছন্দ করে।
- স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল এবং গুরুতর আচরণ।
- শ্লেষ্মা ঝিল্লির শুষ্কতা।
- বিরক্তিকরতা হওয়ার প্রবণতা।
- একগুঁয়ে হওয়ার প্রবণতা প্রদর্শন।
- জয়েন্টে ব্যথা এবং বাত।
- শুষ্ক কাশি এবং ব্রঙ্কাইটিস সহ শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতা।
- নড়াচড়ার সাথে রোগ আরও খারাপ হয়।
ব্রায়োনিয়া আলবা ঔষধের – মূলকথা
- শরীরের সকল সেরাস মেমব্রেণ ও এই মেমব্রেণের ভিতর থাকা যন্ত্রসমূহের উপর এইঔষধ কাজ করে থাকে। প্রত্যেক পেশীতে অবিরাম বেদনা।
- ব্রায়োনিয়া যে জাতীয় বেদনা উৎপন্ন করে তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, সূঁচ ফোটার মত, ছিঁড়ে ফেলার মত, নড়াচড়ায় বৃদ্ধি ও বিশ্রামে উপশম।
- সূঁচফোটার মত বেদনা যেকোন প্রকার নড়াচড়ায় খুব বেশি রকমের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, প্রায় সবক্ষেত্রেই লক্ষণটি পাওয়া যায়, কিন্তু বিশেষ করে বুকের ক্ষেত্রে, চাপে বৃদ্ধি।
- সকল শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীসমূহ-শুষ্ক। ব্রায়োনিয়া রোগী খিটখিটে ।
- মাথা তুলতে গেলে মাথা ঘোরে, চাপবোধ যুক্ত মাথার যন্ত্রণা, ঠোঁট ও মুখগহ্বর শুষ্ক ও ঝলসিয়ে থাকার মত, প্রচণ্ড পিপাসা, আস্বাদ তিতা ।
- পেটের উপরের অংশ অনুভূতি প্রবন এবং পাকস্থলীতে পাথর থাকার মত অনুভূতি, মল লম্বা, শুষ্ক, শক্ত, শুষ্ক কাশি, বাতজনিত বেদনা ও স্ফীতি, সাইনোভিয়্যাল ও সেরাস মেমব্রেনের ভিতর শোথযুক্ত রসক্ষরণ।
- শক্ত মাংসপেশীযুক্ত ও কালোবর্ণের ব্যক্তির উপর ভালো কাজ করে তৎসহ ঐ সকল ব্যক্তির রোগী হওয়া ও উত্তেজিত হওয়ার প্রবণতা থাকে।
- এই ঔষধ ডানদিক, সন্ধ্যাকাল, ও মুক্ত বাতাস পছন্দ করে। ঠাণ্ডা দিনের পর উষ্ণ আবহাওয়া, প্রভৃতি অবস্থা এই ঔষধের কাজ করার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থা।
- শিশু তাকে কোলে করা বা উঠান পছন্দ করে না। শারীরিক দুর্বলতা, সর্ববিষয়ে উদাসীনতা। উপসর্গগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
মন – ভীষন খিটখিটে, সবকিছুই তার কাছে বিরক্তিকর বলে মনে হয়। প্রলাপ, বাড়ী যেতে চায়, রোগীর ব্যবসা সংক্রান্ত কথা বলে।
মাথা —
- মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, মূর্চ্ছা উঠে দাঁড়াবার সময়, মানসিক বিভ্রান্তি। ফেটে যাবার মত, দ্বিখণ্ডিত হবার মত মাথার যন্ত্রণা। মনে হয় যেন ভিতরে থাকা সবকিছুর চাপের দ্বারা ঠেলে বেরিয়ে আসবে, যেন ভিতর থেকে হাতুড়ি দিয়ে ঘা দেওয়া হচ্ছে, নড়াচড়ায়, ঝুঁকলে ও চোখ খুললে বৃদ্ধি।
- মাথার পিছনের অংশে যেন যন্ত্রণা বসে রয়েছে। জাইগোম্যাটিক প্রসেসের দিকে অস্থিগুলি যেন টেনে ধরে। মাথার যন্ত্রণা, নড়াচড়ায় বৃদ্ধি, এমনকি চোখের তারার নড়াচড়ায় পর্যন্ত বৃদ্ধি। কপাল অংশে মাথার যন্ত্রণা, ফ্রন্টাল সাইনাস আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
নাক – যখন ধাতুস্রাব দেখা দেবার কথা সেই সময় বারে বারে নাক দিয়ে রক্তপাত হয়। এছাড়াও সকালের দিকে মাথার যন্ত্রণা উপশমিত করে। সর্দি তৎসহ তীর বেঁধার মত এবং অবিরাম যন্ত্রণা কপালে। নাকের অগ্রভাগের স্ফীতি, স্পর্শ করলে মনে হয় এটি ক্ষতযুক্ত হবে।
কান — শ্রবনেন্দ্রিয়ের গোলযোগের দরুন মাথাঘোরা। (অরাম, নেট্রাম সালফ, সাইলিশিয়া, চায়না)। কানের ভিতর গর্জন, বুজবুজ শব্দ।
চোখ – চাপবোধযুক্ত, পিষে ফেলার মত, অবিরাম বেদনা। গ্লুকোমা। স্পর্শে ও চোখের নড়াচড়ায় টাটানি।
মুখগহ্বর —
- ঠোঁট ঝলসানো, শুষ্ক, ফাটাযুক্ত। মুখগহ্বর, জিহ্বা ও গলা শুষ্ক তৎসহ প্রচুর পিপাসা। জিহ্বা লেপযুক্ত, কালচে বাদামীবর্ণযুক্ত, পাকাশয়িক গোলযোগে জিহ্বা সাদা পুরু লেপযুক্ত।
- তিতো আস্বাদ (নাক্স, লসিকাম)। পুরাতন ধূমপায়ীর নিচের ঠোঁটে জ্বালা। ঠোঁট স্ফীত, শুষ্ক, কালো ও ফাটাযুক্ত।
গলা – শুষ্ক, ঢোক গেলার সময় খোঁচা মারার মত বেদনা, ছাল উঠার মত অনুভূতি। ও সঙ্কুচিত (বেলেডোনা)। কণ্ঠনলী ও শ্বাসনালীতে চটচটে শ্লেষ্মা, বহুবার গলা খাঁকারি দেবার পর সরল হয়, উষ্ণ ঘরে প্রবেশের পর বৃদ্ধি।
পাকস্থলী —
- উঠার সময় বমি বমি ভাব ও মূর্চ্ছা। অস্বাভাবিক প্রকৃতির ক্ষুধা, মুখের আস্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। প্রচুর জলপানের ইচ্ছা। খাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পিত্ত জলবমন। উষ্ণ পানীয়ে বৃদ্ধি, যা বমি হয়ে উঠে যায়।
- পাকস্থলী স্পর্শকাতর। খাবার পর পাকস্থলীতে চাপবোধ, যেন একটা পাথর আছে এইজাতীয় অনুভূতি। কাশির সময় পাকস্থলীতে টাটানি ব্যথা। গ্রীষ্মাকালের উত্তাপে হজম সংক্রান্ত উপসর্গের উদ্ভব। পাকস্থলীর উপরের অংশে স্পর্শকাতরতা।
উদর – যকৃত স্থান স্ফীত, আড়ষ্ট টানভাব। জ্বালাকর, সূঁচফোটার মত বেদনা, চাপে, কাশির সময়, শ্বাস-প্রশ্বাসে বৃদ্ধি। পেটের দেওয়াল স্পর্শকাতর।
মল — কোষ্ঠকাঠিণ্য, মল শক্ত, শুষ্ক, যেন পুড়ে গেছে, মল আয়তনে বেশ বড়। মল বাদামীবর্ণের, পুরু, রক্তমিশ্রিত, সকালে ও নড়াচড়ায়, গরম আবহাওয়ায়, উত্তপ্ত হবার পরে, ঠাণ্ডা পানীয় পান করার পরে, গরম আবহাওয়ায় সাময়িক বিরামকালে বৃদ্ধি।
প্রস্রাব – লাল, বাদামী, অনেকটা বিয়ারের মত দেখতে, অল্প গরম।
স্ত্রীরোগ —
- মাসিক ঋতুস্রাব নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে, পরিমানে প্রচুর, নড়াচড়ায় বৃদ্ধি, তৎসহ পায়ে ছিঁড়ে ফেলার মত বেদনা, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে নাক দিয়ে রক্তস্রাব। অথবা দ্বিখণ্ডিত করার ন্যায় মাথার যন্ত্রণা।
- গভীর শ্বাস নেবার পর ডিম্বাশয় স্থানে সূঁচ ফোটার মত বেদনা, অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ডানদিকের ডিম্বাশয়ে বেদনা, যেন মনে হয় অংশটি ছিঁড়ে পড়ে যাবে, ঊরুস্থান পর্যন্ত বেদনা প্রসারিত হয়।
- স্তনের দুধকেন্দ্রিক জ্বর। মাসিক ধাতুস্রাবরে সময় স্তনে বেদনা। স্তনদ্বয় উত্তপ্ত, এবং বেদনাদায়ক, শক্ত। স্তনগ্রন্থির ফোঁড়া।
- ধাতুস্রাব দেখা দেবার পরে বারে বারে নাক থেকে রক্তস্রাব। ধাতুস্রাব সম্বন্ধীয় ব্যতিক্রম তৎসহ পাকাশয়িক লক্ষনাবলী।
- ডিম্বাশয়ের প্রদাহ। দুটি ধাতুকালের মধ্যবর্তী সময়ে যন্ত্রনা, পেটে ও বস্তিকোটর স্থানে অত্যন্ত টাটানি ব্যথা।
শ্বাস–প্রশ্বাস —
- কণ্ঠনলী ও শ্বসনলীতে টাটানি ব্যথা। স্বরভঙ্গ, মুক্ত বাতাসে বদ্ধি।
- শ্বাসনলীর উপরের অংশের গোলযোগের দরুন শুষ্ক, দমবন্ধকর কাশি। কাশি শুষ্ক, রাত্রিতে দেখা দেয়, কাশির ধমকে রোগী উঠে বসতে বাধ্য হয়।
- খাবার পর বা পান করার পরে বৃদ্ধি, তৎসহ বমি, তৎসহ বুকের ভিতর সূঁচফোটার মত বেদনা এবং মরচে বর্ণের শ্লেষ্মা উঠে।
- বারে বারে গভীর শ্বাস নেবার ইচ্ছা, ফুসফুস ফুলতে বাধ্য হয়। কষ্টকর, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, সবরকম নড়াচড়ায় বৃদ্ধি, বুকের ভিতর সূঁচ ফোটার মত বেদনা থেকে এই অবস্থা দেখা দেয়।
- কাশি, তৎসহ রোগীর মনে হয় বুকটি খণ্ড খণ্ড হয়ে বেরিয়ে যাবে, রোগী তার মাথা বুক্কাস্থির উপর চেপে ধরে, বুক চেপে ধরতে বাধ্য হয়। ঘুংড়ি কাশি ও প্লুরোনিউমোনিয়া। শ্লেষ্মা ইটের বর্ণের ন্যায়, চটচটে, এবং জেলির দলার মত হয়ে পড়ে।
- শ্বাসনলীতে চটচটে শ্লেষ্মা, বহুবার গলা খাঁকারি দিলে তবে সরল হয়। গরম ঘরে প্রবেশ করলে কাশি শুরু হয় (নেট্রাম কার্ব)। বুক্কাস্থির নীচে ভারীবোধ, ডানদিকের কাঁধ পর্যন্ত এটি প্রসারিত হয়।
- কাশি গরম ঘরে প্রবেশ করলে বৃদ্ধি। হৃদপিণ্ড স্থানে সূঁচফোটার মত বেদনা।
পিঠ – গ্রীবা দেশে বেদনাদায়ক আড়ষ্টভাব। কোমরে সূঁচ ফোটার মত বেদনা ও আড়ষ্টভাব।
অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ –
- হাঁটু আড়ষ্ট ও বেদনাদায়ক। পায়ের পাতায় উষ্ণ স্ফীতি। সন্ধিস্থান লাল, স্ফীত, উষ্ণ তৎসহ সূঁচ ফোটার মত ও ছিঁড়ে ফেলার মত বেদনা; সামান্য নড়াচড়ায় বৃদ্ধি।
- প্রতি স্থানে চাপ দিলে রোগী বেদনা অনুভব করে। একাদিক্রমে বাম হাত ও বাম পা নাড়ায়। (হেলেবোরাস)।
চামড়া – হলুদ, ফ্যাকাশে, স্ফীত, শোথের মত, উত্তপ্ত ও যন্ত্রণাদায়ক। মেদগ্রন্থির স্রাব। মাথার চুল ভীষন তৈলাক্ত।
ঘুম — ঝিমুনি, ঘুম আসার আগে চমকিয়ে উঠে। প্রলাপ, নিজের ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে এবং যে সকল বিষয় সে পড়েছে সেই সম্পর্কে ব্যস্ত।
- নাড়ী পূর্ণ, শক্ত, টানভাব এবং দ্রুত। শীতবোধ তৎসহ বাহ্যিক ঠাণ্ডা বোধ, শুষ্ক কাশি, সূঁচফোটার মত বেদনা। শরীরের ভিতর উত্তপ্ত।
- সামান্য পরিশ্রমে টক গন্ধযুক্ত ঘাম। সহজেই, প্রচুর ঘাম। বাত রোগ ও টাইফয়েড জ্বর যদি পাকাশয়িক যকৃৎ সম্বন্ধীয় গোলযোগে উপস্থিত থাকে।
কমা–বাড়া – ব্রায়োনিয়া আলবার বৃদ্ধি : গরমে, যে কোন প্রকার নড়াচড়া, সকালে, আহারে, গরম আবহাওয়া, পরিশ্রমে, স্পর্শে। কিছুতেই বসতে পারে না, মূর্চ্ছা যায় ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
উপশম – যন্ত্রণার দিক চেপে শুলে, চাপে, বিশ্রামে, ঠাণ্ডা বস্তুতে।
সম্বন্ধ – পরিপূরক যখন ব্রায়োনিয়া আলবা ব্যর্থ হয়, তখন রাসটক্স, অ্যালুমিনা।
দোষঘ্ন — একোনাইট, ক্যামোমিলা, নাক্স।
তুলনীয় – অ্যাসক্লিপ টাব, কেলিমিউর, টিলিয়া।
শক্তি – ১ম থেকে ১২ শক্তি।
বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।
( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )