মানুষের শরীরে জ্বর কেন হয়?

জ্বর(Fever) যা পাইরেক্সিয়া নামেও পরিচিত। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হলে জ্বর হয়।
অর্থ্যাৎ জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রার উপরে বৃদ্ধি পায় , সাধারণত সংক্রমণের কারণে এই জ্বর হয়।
মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার সীমা ৩৬–৩৭.২ °সে (৯৬.৮–৯৯.০ °ফা) । জ্বর হল শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রার উপরে বৃদ্ধি।
জ্বর হয় শরীরের তাপমাত্রা ১০০–১০৪° ফা (৩৭.৩–৩৮°সে) বৃদ্ধি হলে জ্বর পাওয়া যায় ।
অনেক কারণেই শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হতে পারে। সর্দিকাশির মতো সাধারণ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হতে পারে।
জ্বর যেকোনো রোগের একটি লক্ষণ বা উপসর্গ হতে পারে।তাই, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হওয়াকে শরীরের ভেতরের কোনো রোগের সতর্কবার্তা বলা যেতে পারে।
মৃদু জ্বরের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক দিনের মধ্যে নিজেই সমাধান হয়ে যেতে পারে।
জ্বরের লক্ষণ
মানুষের শরীরে জ্বর কেন হয়?
শরীরের ভেতরে যখন কোনো জীবাণু আক্রমণ করে, সেটা ঠেকাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভিন্ন কোষ থেকে পাইরোজেন নামক এক ধরনের পদার্থ নিঃসরণ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে লড়াই করতে শুরু করে। তখনি শরীরের তাপমাত্রা অনুভূত হয়।
টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ
এই জ্বরের অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে উচ্চমাত্রায় তাপমাত্রা।
শরীরের তাপমাত্রার সাথে মাথাব্যথা, বমি, পেট ব্যথা এবং আমাশয় ও ডায়রিয়াও থাকে।
ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, মারাত্মক আকার ধারণ করলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে টাইফয়েড রোগের জীবাণু দ্রুত ছড়ায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে টাইফয়েড রোগ সনাক্ত করতে হয় ।
চোরা জ্বরের লক্ষণ
চোরা জ্বর সাধারণত মানুষের যকৃত এবং অস্থি মজ্জাতে সংক্রমন ঘটায় । এই রোগের লক্ষণ হলো – শরীরের ভেতরে ভেতরে তাপমাত্রার থাকে , বার বার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, ওজন হ্রাস, রক্ত শূন্যতা,গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং যকৃতের মাঝে ব্যাপকভাবে আক্রমণ করা।
যারা স্যাঁতস্যাতে পরিবেশে বাস করে, মাটির ঘরে বাস করে বা গোয়ালঘরের আশে পাশে থাকে তারাই বেশি এই রোগে আক্রান্ত হয়।
ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার
ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ
- হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ৭-৮ দিন ধরে চলতে থাকে
- শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ১০২-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়
- জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা(হালকা থেকে গুরুতরহয় )
- জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকে,নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়া
- পেশী এবং জয়েন্টে অসহ্য ব্যথা – হালকা থেকে গুরুতর
- শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সাথে পেট ব্যথা, ডায়রিয়া
- বমি বমি ভাব অথবা বমি হয়
- মুখে বিস্বাদ, ক্ষুধামান্দ্য হয়
- শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
- গলায় প্রচুর ব্যথা করে
- মুখের ফোলে যেতে পারে
- চোখ লাল হওয়া এবং জ্বলা হয়
- ত্বকে ফুসকুড়ি উঠতে পারে
- প্রচন্ড জ্বরের কারণে হলে বাচ্চারা অজ্ঞান হতে পারে
জ্বর হলে করণীয় কি? অথবা জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায়
- যথাযথ বিশ্রাম নিতে হবে ।
- প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন।
- পুরো শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে।
- ব্যাথা বেশি হলে, ব্যথা-নাশক ওষুধ খান।
- পুষ্টিকর এবং হালকা খাবার খান যা তাড়াতাড়ি হজম হয় ।
- খাদ্যে ভিটামিন সি জাতীয় খাবার , মধু , আদা যুক্ত রং চা ইত্যাদি যোগ করুন ।
- ঘরের ভেতর এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখুন।
- শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হওয়ামাত্র চিকিত্সকের পরামর্শ নিন । চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করবেন না, হিতে বিপরীত হতে পারে , এমনকি রোগ আরও খারাপ হয়।
- খুব গরমের মতো চরম তাপমাত্রায় থাকবেন না, কারণ চরম তাপমাত্রা আপনার শরীরকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
- ঠাণ্ডা লাগলে কাপড় বা কম্বলের অনেক স্তর ব্যবহার করবেন না।
বড়দের ঘন ঘন জ্বর হওয়ার কারণ
অনেকের একবার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভালো হলে আবার কিছুদিন পর হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে । একটি বড় ধরণের রোগের সংক্রমকের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় বা জ্বরের তাপমাত্রা বার বার ফিরে আসে ।
বার বার জ্বর আসার কারণ
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ঘন ঘন জ্বর হওয়ার অন্যতম কারণ ।
- নিউমোনিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করলে ঘন ঘন শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে ।
- ফুসফুসে যক্ষা সহ আরো বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সাধারণত ফুসফুসের পানি জমে গেলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে ।
- ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্তহলে ঘন ঘন জ্বর আসতে পারে ।
- অনেক ক্যান্সার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এবং ঘন ঘন জ্বর আসতে পারে।
- এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ঘন ঘন জ্বর আসতে পারে।
- মূত্র তন্ত্রের ত্রুটি অথবা কিডনির সমস্যা দেখা দিলে ঘন ঘন শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে ।
- ডায়াবেটিসের মাত্রা বেশি থাকলে যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে তাদের ঘন ঘন জ্বর আসতে পারে।
- ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
- ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে
- ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয়
- ডেঙ্গু জ্বর হলে কি খেতে হবে
- ডেঙ্গু জ্বর হলে কি গোসল করা যাবে
জ্বর হলে কি খাওয়া উচিত
- ঘরে তৈরি ভিটামিন সি–যুক্ত তাজা ফলের রস যেমন কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, সবুজ আপেলের জুস ও আনারসের রস শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
- জ্বরে চিকেন-ভেজিটেবল স্যুপ দুর্বলতা কমাতে সাহায্য করে।
- আদা চা অথবা যেকোনো হারবাল চা খেতে পারেন। চায়ের সঙ্গে লেবু, মধু, তুলসীপাতা, পুদিনাপাতা ও লং মিশিয়ে খেলে খুবই উপকার পাওয়া যায় ।
- দুধ দিয়ে পাতলা সুজি রোগী যথেষ্ট শক্তি পাবে।
- জ্বরের রোগীর জাউ ভাতের মতো খাবার খাওয়া উচিত, যে খাবারগুলো হজম করতে সুবিধে হয়।
- বমির ভাব না থাকলে,সেদ্ধ ডিম যা জ্বরের সময় শরীরের দুর্বলতা দূর করে।
- টক দই হজমক্রিয়া জ্বরের সময় রুচি ফেরাতে সাহায্য করে।
জ্বর ঠোসা কেন হয়?
‘হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস’ নামের একটি ভাইরাসের কারণে এই জ্বর ঠোসা হয় । এই ভাইরাস শরীরে একবার প্রবেশ করলে সেটি সারাজীবন থাকে ।
এই ভাইরাস শরীরে সাধারণত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, মাঝেমাঝে জ্বর ঠোসা আকারে জেগে উঠে । ভাইরাস সক্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ।
জ্বর ঠোসা হলে কি করা উচিত?
- সাইট্রাস জাতীয় ফল ,যেমন – কমলালেবু খেতে পারেন।
- ঠোসায় হাত বা নখ লাগাবেন না।
- বিশুদ্ধ মধু ব্যবহার করতে পারেন
- ব্যথা কমানোর বরফ অথবা ঠাণ্ডা সেঁক লাগাতে পারেন।
- গ্লিসারিন লাগাতে পারেন।
জ্বর হলে কি ঔষধ খাওয়া উচিত
অনেকে জ্বর হলে সাথে সাথে ঔষধ খাওয়া শুরু করেন , এটা ঠিক নয় । জ্বরের পরিপূর্ণভাবে আসার পর ঔষধ খাওয়া শুরু করতে হবে। কিছু হোমিও ঔষধ যা এই রোগে প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট জন্য ভালো কাজ করে। যেমনঃ
Aconitum Nap-30: জ্বরের প্রাথমিক পর্যায়ে Aconite Nap একটি চমৎকার ঔষধ । অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা আবহাওয়ায় হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়,তাহলে এই ঔষধ খেতে পারেন ।
এই রোগীর সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে -রুগী যদি তীব্র পিপাসা , শরীরের ব্যথা এবং শরীরের তাপমাত্রা খুবই বেশি থাকে ।
Belladonna -200: উচ্চ-তাপমাত্রার জ্বরের জন্য একটি কার্যকর। শরীরের উপরের অংশ বেশি গরম অনুভব করে কিন্তু পা ঠান্ডা থাকে। এই রোগীর সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে- পিপাসা ছাড়াই শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাথা ব্যাথা সহ শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি । ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেয় , কিছুক্ষন পর শীত শীত করে আবার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
Bryonia alb – 30: শরীরে ব্যথা সহ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে , Bryonia alb শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
এই রোগীর সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে- পানির পিপাসা বেশি , শুষ্ক মুখ, শরীরের ব্যথা, শুকনো কাশি এবং জ্বরের পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে।
Gelsemium – 30: এই রোগীর সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে-মাথা ঘোরা, ঝিমুনি, শরীর দুর্বলতার সাথে পেশীতে ব্যাথা এবং প্রচন্ড মাথা ব্যাথা থাকে ।
Rhus Tox-200: শরীরের চরম ব্যথার সাথে যুক্ত জ্বরের জন্য Rhus Tox চমৎকার ঔষধ । বিশেষ করে যদি বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, তাহলে এই ঔষধ কার্যকর ।
Nux Vom- 30: পেটের যেকোনো লক্ষণ সহ জ্বরের জন্য Nux vomica উত্তম কাজ করে ।
Ferrum Phos 6X: এই বায়োকেমিক ঔষধ জ্বরের বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যকর, যা শরীরের তাপমাত্রা কমাতে যাহায্য করে । জ্বরের প্রাথমিক পর্যায়ে Ferrum Phos ঔষধ খেতে পারেন।