রাস টক্সিকোডেনড্রন
(RHUS TOXICODENDRON)

রাসটক্স এনাকার্ডিয়েসী জাতীয় উদ্ভিদ। উত্তর আমেরিকার সর্বত্র জঙ্গলে, ঝোপে ঝাড়ে হয়ে থাকে, গুল্ম জাতীয় বিষাক্ত লতানো গাছ। গাছের তাজাপাতা ফুল হবার সময়ের আগে ওষুধ তৈয়ারী করতে সংগ্রহ করা হয়। সাধারণতঃ জুন-জুলাই মাসে যখন এর উপর সূর্যালোক পড়ে না, তখনই উদ্ভিদটি সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত হয়।
ছিড়ে ফেলার মত বা মচকে যাওয়ার মত ব্যথা, স্থীরভাবে শুয়ে বা বসে থাকলে ব্যথা বৃদ্ধি, কিছুক্ষণ নড়াচড়া করলে উপশম। অত্যন্ত অস্থিরতা, বিছানায় একভাবে শুয়ে থাকতে পারে না, এপাশ ওপাশ করে, কারন নড়াচড়াতে কিছুটা উপশম হয়।
চর্মের উপর ইহার প্রধান ক্রিয়া, বাতজনিত বেদনা, শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর পীড়ানিচয় এবং টাইফয়েড ধরণের জ্বর—এই সব ক্ষেত্রে এই ঔষধ প্রায়শঃই নির্দেশিত হয় ।
রাসটক্স সৌত্রিক তন্তুনিচয়কে বিশেষভাবে আক্রমণ করে-সন্ধিস্থলগুলি, পেশীবন্ধনী, স্নায়ু, ধমনী পেশী প্রভৃতির বিবিধ প্রকারের খোল বা আবরণ, কন্ডরার সম্প্রসারণ, ইত্যাদি এবং এই আক্রমণের ফলে বেদনা এবং অসাড়তার সৃষ্টি হয়।
অস্ত্রোপচারের পরে বিবিধ উপসর্গ। বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে এইরূপ যন্ত্রণা। নড়াচড়ায় রাসটক্সের রোগী নমনীয় হইয়া উঠে আড়ষ্টভাব ক্রমশঃই হাল্কা হইয়া যায়। এবং এই কারণেই যে। স্থান পরিবর্তন করিলে কিছুক্ষণের জন্য উপশম অনুভব করে।
জোর টান পড়ায় অথবা মচকাইয়া গেলে, সাধ্যাতীত ভারী জিনিস উঠাইলে, ঘর্মস্রাবকালে ভিজিয়া গেলে যে সমস্ত পীড়ার সৃষ্টি হয়। রক্তের দূষিত অবস্থা ও তৎসহ জ্বর।
রাসটক্সের আলোচনাঃ
১। যে তিনটি ঔষধের প্রধান লক্ষণ অস্থিরতা, রাসটক্স তাদের মধ্যে তৃতীয়। আবার অন্যভাবে আমরা বলতে পারি অস্থির ক্রয়ীর তৃতীয় হল রাসটাক্স। তবে রাসটক্সের এই অস্থিরতা অবিরাম বেদনা ও টাটানি জন্য জন্মে, এবং নড়লে -চড়লে সামান্য সময়ের জন্য হলেও উপশম পায়, তাই অস্থিরতা দেখা দেয়।
২। নড়তে-চড়লে বৃদ্ধি ব্রায়োনিয়ার এবং নড়তে-চড়লে হ্রাস রাসটাক্সের পরিচালক লক্ষণ। একোনাইট ও আর্সেনিকের মত রাসটক্সেও রোগী একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে চায় অর্থাৎ এপাশ-ওপাশ করে। কারণ এই প্রকার পার্শ্ব পরিবর্তনে রাসটাক্সে উপশম হয়; কিন্তু একোনাইট ও আর্সেনিকে উপশম হয় না। ব্রায়োনিয়ায় রোগী যতই নড়াচড়া করে, ততই তার যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাসটক্সে যতই বেশী ও বেশীক্ষণ ধরে নড়াচড়া করে, ততই সে ভাল বোধ করে। পুরাতন রোগে, যেমন—পুরাতন বাতেও রোগীকে নড়াচড়া করতে হয়।
তবে এক্ষেত্রে যখন সে প্রথম নড়াচড়া করতে আরম্ভ করে, তখন তার যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় কিন্তু যখন সে ক্রমাগত নড়াচড়া করে, তখন তার উপশম বোধ হয়। তবে কি তরুণ কি পুরাতন কোনরকম রোগেই রোগী অনেকক্ষণ স্বচ্ছন্দে শুয়ে থাকতে পারে না, কারণ ওতে তার বেদনা আরম্ভ হয়। তাছাড়া যদিও প্রথম সঞ্চালনে তার কষ্টঅনুভূত হয় তবুও সে নড়াচড়া করে বা না নড়াচড়া করে থাকতে পারে না। রাসটক্সের অস্থিরতাজনক বেদনা একোনাইটেরও আর্সেনিকের মত অত বেশী নয়। উহার উত্তেজনাও একোনাইটের উত্তেজনা অপেক্ষা কম। রাসটক্স ও আর্সেনিক টাইফয়েড জ্বরে সচরাচর ব্যবহৃত হয়, কিন্তু একোনাইট কদাচিৎ ব্যবহৃত হয় অথবা একেবারেই ব্যবহৃত হয় না। যদিও তিনটি ঔষধেই অস্থিরতা লক্ষণ আছে।
৩। কেউ কেউ মনে করে যে প্রকৃত টাইফয়েড জ্বরে আর্সেনিক সর্বপ্রধান ঔষধ। কিন্তু যে সকল রোগে টাইফয়েডের মত লক্ষণ দেখা যায়, তাতে রাস টক্সও আর্সেনিকের মত সমান উপযোগী। টাইফাস শব্দের অর্থ ধূম বা সংজ্ঞাহীনতা। সেরিব্রাল বা মস্তিষ্কসংক্রান্ত, অ্যাবডোমিন্যাল বা উদরসংক্রান্ত ও নিউমোটাইফাস বা ফুসফুস সংক্রান্ত সকল প্রকার টাইফয়েড জ্বরেই অন্যান্য ঔষধের মত রাস টক্সও উপযোগী। বিশেষ করে জ্বরে বা দাহিক রোগে যখন মস্তিষ্ক ধূমাচ্ছন্ন বা মেঘাচ্ছন্ন হয় অথবা সংজ্ঞাহীনতা জন্মে এবং তার সঙ্গে রোগী মৃদু প্রলাপ বকে, জিভ শুকনো ইত্যাদি লক্ষণ বর্তমান থাকে, তখন রাসটক্স উপযোগী। শুকনো জিভ, কালচে লেপে আবৃত জিহ্বা, জিভের অগ্রভাগে ত্রিভূজাকার লালবর্ণ রাসটক্স এর বিশেষ প্রয়োগ লক্ষণ।
৪। সবিরাম জ্বরের শীতবোধ তৎসহ শুষ্ক কাশি এবং অস্থিরতা রাসটাক্সের একটি বিশেষ লক্ষণ। অতীব দৌর্বল্যবিশিষ্ট জ্বর; অস্থিরতা, কম্পণ। তাপাবস্থায় আমবাত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোস্কার উদ্ভেদসহ জ্বর। শীতবোধ, মনে হয় যেন শীতল জল তাহার উপর ঢালিয়া দেওয়া হইতেছে, তাহার পরে তাপাবস্থা এবং গা-মোড়ামুড়ি দিবার ইচ্ছা।
৫। তন্তুময়, পেশীময় ও কোষময় টিসুতে রাসটক্সের বিশেষ ক্রিয়া দেখা যায়। পেশীগুলিতে আড়ষ্টতা ও টাটানি বোধ হলে, বিশেষ করে বাতের ফলে উৎপন্ন হলে বা মচকে গিয়ে হলে, বা কোন ভারী বস্তু বা বোঝা তোলার জন্য চাড় লাগলে বা স্পেন হলে, অথবা উৎকটভাবে পেশী চালনার জন্য হলে বা ঠাণ্ডা লেগে, বিশেষ করে আর্দ্র শীতলতার ফলে হলে, রাস টাক্স উপযোগী।
৬। স্কার্লেটিনা, কর্ণমূল প্রদাহে (Parotitis) ও নীচের চোয়ালের গ্রন্থিস্ফীতিতায় , ডিপথিরিয়া বা চক্ষু কোটরের সেলুলাইটিসের জন্য রাস টাক্স উপকারী।
৭। চর্মরোগেও রাসটক্স একটি অত্যুৎকৃষ্ট ঔষধ। রাসটাক্সের বিষক্রিয়ায় চর্মরোগ জন্মে, তাই এর দ্বারা আমাদের আরোগ্য বিধান অনুযায়ী চর্মরোগ নিশ্চয়ই আরোগ্য প্রাপ্ত হবে। রাসটক্সে জলপূর্ণ স্ফোটক বা ফোস্কার ন্যায় উদ্ভেদ জন্মায়। তবে জলপূর্ণ ফোস্কাবিশিষ্ট বিসর্প (erysipelas) সঙ্গে অস্থিরতা ও রাসটক্সের মস্তিষ্কলক্ষণ বর্তমান থাকলে, রাসটক্সে দ্রুত আরোগ্য হয়।
কিন্তু চৰ্ম্ম মসৃণ, লাল ও চকচকে হলেও তার সঙ্গে প্রবল জ্বর ও প্রলাপ থাকলে রাসটক্সে কোন উপকার দেখা দেয় না। বেলেডোনা বা অন্য কোন ঔষধ ব্যবহার করতে হবে।
৮। বসন্তের উদ্ভেদগুলি নীলবর্ণের হলে ও টাইফয়েডের লক্ষণ পেলে রাসটক্স উপকারী। হার্পিস জোস্টারে মনে হয় রাসটক্সের চেয়ে অন্য কোন ঔষধ উপযোগী নয়।
পুরাতন চর্মরোগেও তরুণ চর্মরোগের মত রাসটাক্স অতিশয় উপকারী। জলপূর্ণ স্ফোটকবিশিষ্ট একজিমা এর দ্বারা আবোগ্য হয়। সাধারণতঃ উদ্ভেদগুলিতে খুব চুলকানি থাকে, কিন্তু চুলকালে তেমন কিছু উপশম হয় না। এইসকল যোগে বোগীর স্থানিক লক্ষণ ও সৰ্বাঙ্গীন লক্ষণ (ধাতুগত লক্ষণ) উভয়ই বিচার বিবেচনা করতে হয়। মাত্রা সম্বন্ধে উচ্চ ও নিম্নক্রম উভয়ই উপযোগী।
বৃদ্ধি :—
ঝড়ের আগে, ঠান্ডা, ভেজা বর্ষার দিনে, রাতে বিশেষতঃ মাঝ রাতের পরে, ঘাম বার হবার সময় ভিজা বা স্নান করে, বিশ্রামের সময়।
উপশম : –
গরম, শুকনো দিনে, গায়ে ঢাকা দিলে, গরম বা মৃদু গরম বিশ্রামে শুরু হয় বা বেড়ে যায় ও নড়াচড়ায় কমে যায়। রাসটক্স বিষাক্ততায় জ্বালা ও চুলকানি সিপিয়া প্রায়ই তাড়াতাড়ি কমিয়ে দেয়। কয়েকদিনের মধ্যেই ফুস্কুড়িগুলো শুকিয়ে ফেলে।
রাসটাক্সের বিষাক্ততায় কুফল :–
সমবিধান শতে শক্তিশালী শক্তিকৃত রাসের উচ্চ শক্তি দ্বারা সেরে যায়—ঐ থেকে উৎপন্ন চর্মরোগ কখনই বাহ্য প্রয়োগের ওষুধ (মলম) দিয়ে চিকিৎসা করতে নেই—এতে রোগ চাপা পড়ে মাত্র, কখনই আরোগ্য হয় না।
শক্তি :–
৬, ৩০, ২০০ হতে উচ্চতম শক্তি, ০/১ হতে ০/৩০ শক্তি, বাত রোগের ক্রণিক অবস্থায় উচ্চ শক্তিতে সব চেয়ে বেশী সাফল্য পাওয়া গেছে।
বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।
( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )
খুব ভালো
Thanks