মাথা ব্যাথা
মাথা ব্যাথা কোন রোগের লক্ষণ ?
মাথা ব্যথা প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন রোগ বা অবস্থার একটি উপসর্গ হতে পারে।
মাথাব্যথা গুরুতর অন্তর্নিহিত অবস্থার লক্ষণও হতে পারে যেমন- সংক্রমণ , মাথায় আঘাত, উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কের টিউমার বা কিছু স্নায়বিক ব্যাধি।
মূল বিষয় হল মাথাব্যথার বৈশিষ্ট্যগুলি যেমন- তীব্রতা, অবস্থান, সময়কাল, সহগামী উপসর্গ ।
যদি কেউ গুরুতর বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা অনুভব করে, বিশেষ করে যদি তারা হঠাৎ করে বা অন্যান্য সম্পর্কিত উপসর্গগুলির সাথে থাকে, তবে সঠিক মূল্যায়ন এবং নির্ণয়ের জন্য অবিলম্বে চিকিত্সার পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাব্যথা বিভিন্ন রোগ বা অবস্থার উপসর্গ হতে পারে। যেমনঃ –
- মাইগ্রেন: মাইগ্রেন হল এক ধরনের মাথাব্যথা যা প্রায়শই মাথার একপাশে প্রচণ্ড স্পন্দিত ব্যথা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এগুলি বমি বমি ভাব, বমি এবং আলো এবং শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা দ্বারা অনুষঙ্গী হতে পারে।
- টেনশন মাথাব্যথা: এটি হল সবচেয়ে সাধারণ ধরনের মাথাব্যথা, সাধারণত মাথার উভয় পাশে একটি নিস্তেজ, ব্যথাযুক্ত ব্যথা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এটি প্রায়ই স্ট্রেস, পেশী টান বা দুর্বল ভঙ্গির সাথে সম্পর্কিত।
- সাইনোসাইটিস: সাইনাসের প্রদাহ বা সংক্রমণের ফলে কপাল, গালে এবং চোখের চারপাশে ব্যথা এবং চাপ পড়তে পারে, যা প্রায়শই সাইনাস মাথাব্যথা হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
- উচ্চ রক্তচাপ: উচ্চ রক্তচাপ মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি গুরুতর বা আকস্মিক হয়। তবে , উচ্চ রক্তচাপের বেশিরভাগ লোকই মাথাব্যথা অনুভব করেন না।
- মস্তিষ্কের টিউমার: মস্তিষ্কের টিউমার মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি মাথার খুলির মধ্যে চাপ বাড়ায়। এই মাথাব্যথাগুলি ক্রমাগত হতে পারে এবং সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে পারে।
- সংক্রমণ: কিছু সংক্রমণ, যেমন -মস্তিষ্ক এবং মেরুদন্ডের চারপাশের ঝিল্লির প্রদাহ, মস্তিষ্কের প্রদাহ, জ্বর, ঘাড় শক্ত হওয়া এবং অন্যান্য উপসর্গের সাথে গুরুতর মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে। এছাড়া মাথার ধমনীতে প্রদাহ এবং দৃষ্টি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
- স্ট্রোক: হঠাৎ গুরুতর মাথা ব্যথা স্ট্রোকের একটি উপসর্গ হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি শরীরের একপাশে দুর্বলতা বা অসাড়তা, কথা বলতে সমস্যা বা দৃষ্টি সমস্যাগুলির মতো অন্যান্য লক্ষণগুলির সাথে থাকে।
মাথা ব্যথা কখনও কখনও একটি গুরুতর অন্তর্নিহিত অবস্থা নির্দেশ করতে পারে, বেশিরভাগ মাথাব্যথা গুরুতর কিছুর কারণে হয় না।
যদি আপনি গুরুতর বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা অনুভব করেন, বা যদি মাথাব্যথার সাথে অন্যান্য সম্পর্কিত উপসর্গগুলি থাকে, তাহলে সঠিক মূল্যায়ন এবং নির্ণয়ের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মাথা ব্যাথা হলে করণীয়
- কাজের চাপে বিশ্রাম না নেয়ার কারণে অনেক সময় মাথাব্যথা হয়ে থাকে।
- মাথা ব্যথা অনুভব করলে শান্ত থাকুন, চোখ বুজে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম না মাথা ব্যাথা হয় , মাথা ধরলে অবশ্যই ঘুমাতে হবে।
- মাথার দুটো পাশ যদি খানিক ক্ষণের জন্য আঙুলের ডগা দিয়ে ম্যাসাজ করেন, তবে আরাম পাবেন ও ক্লান্তি দূর হবে।
- অতিরিক্ত আলোর কারণে অনেক সময় মাথাব্যথা হয়ে থাকে। তাই মাথা যন্ত্রণা করলে ঘরের আলো কমিয়ে দিন।
- কম্পিউটার স্ক্রিন, ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকুন। বাইরে থাকলে ভালো মানের রোদচশমা ব্যবহার করুন।
- খেতে পারেন চা-কফি। চা বা কফিতে উপস্থিত ক্যাফিন মাথা যন্ত্রণা কমাতে ভালো কাজ করে। আর কালো চায়ে আদা-লবঙ্গ ও মধু মিশিয়ে খেলে মাথা যন্ত্রণায় আরাম পাওয়া যায়।
- আদা মাথার রক্তনালির প্রদাহ কমাতে সাহায্য করবে।খেতে পারেন চা সাথে আদার রস ও লেবুর রস মিশিয়ে খান। মাথা ব্যথা থাকলে দিনে দুই থেকে তিনবার এটি খেতে পারেন।
- এক চা চামচ শুকনো আদা গুঁড়ো, দুই টেবিল চামচ পানির মধ্যে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এটি কয়েক মিনিটের জন্য কপালে লাগিয়ে রাখুন। এতে ব্যথা কমবে। এ ছাড়া আদা গুঁড়ো বা কাঁচা আদা সিদ্ধ করতে পারেন। এবার এই সিদ্ধ পানিতে ভাপ নিন।
- পুদিনা পাতার চাও খেতে পারেন। পুদিনা পাতায় রয়েছে ম্যানথল ও ম্যানথন। এই উপাদানগুলো মাথা ব্যথা দূর করার জন্য খুব উপকারী।
তীব্র মাথা ব্যাথার ঔষধ
মাথা ব্যাথার হোমিও ঔষধ
Belladonna
- এই হোমিওপ্যাথিক ওষুধটি মাইগ্রেনের থেকে মুক্তির একটি ভালো ওষুধ ।
- মাথাঘোরা, তৎসহ বামদিকে বা পিছন দিকে পড়ে যাবার মত অনুভূতি।
- খুব সামান্য স্পর্শেও কষ্ট পায়। তীব্র দপদপানি ও উত্তাপ।
- হৃদকম্প, মাথার ভিতর হৃদকম্পের শব্দ প্রতিধ্বনি হয়, তৎসহকষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রণা, পূর্ণতা, বিশেষতঃ কপালের ভিতর, এছাড়া মাথার পিছনের দিকে ও রগের দিকে।
- সর্দিজ স্রাব চাপা পড়ার ফলে মাথার যন্ত্রনা হঠাৎ করে চিৎকার করা।
- যন্ত্রণা, আলোতে, শব্দে, ঝাঁকুনি, শুয়ে থাকলে এবং বিকালের দিকে বৃদ্ধি পায়, চাপে ও হেলান দেওয়া অবস্থায় থাকলে উপশম।
- মাথা বালিশের উপর গুঁজে থাকে, মাথা পিছনদিকে ঝুঁকে রাখে ও বালিশে একদিক থেকে অপরদিকে চালাতে থাকে।
- সর্বদা ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা।
- চুল ফেটে যায়, শুষ্ক ও উঠে যায়।
- মাথার যন্ত্রণা, ডানদিকে এবং শুয়ে থাকলে বৃদ্ধি, ঠাণ্ডা লাগা প্রকৃতির কুফল ।
- চুল কাটার পর মাথার যন্ত্রণা।
Nux Vomica
- মাথার পিছনের অংশে অথবা চোখের উপর বেদনা তৎসহ মাথাঘোরা; মনে হয় যেন, মস্তিষ্কটি বৃত্তাকারে ঘুরছে।
- অতি অনুভূতি প্রবণ।
- মাথাঘোরা, তৎসহ অল্প সময়ের জন্য অচৈতন্য হয়ে পড়ে।
- মাতালের মত অনুভূতি, সকালে, ধূমপানে, মানসিক পরিশ্রমে মদ্যপানে, কফিপানে, মুক্ত বাতাস প্রভৃতিতে বৃদ্ধি।
- মাথার ব্রহ্মতালুতে চাপ দেবার মত বেদনার অনুভূতি, মনে হয় যেন একটি পেরেক ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- সকালে ও রাত্রে আহারের পরে মাথা ঘোরা।
- মাথার চামড়া স্পর্শকাতর।
- মাথা কপাল অংশে বেদনা, তৎসহ কোনকিছুর উপর মাথাটি চেপে ধরার ইচ্ছা।
- মাথায় রক্ত সঞ্চয় হেতু বেদনা, তৎসহ সংশ্লিষ্ট থাকে অর্শ।
- রৌদ্রে মাথার বেদনা দেখা দেয় ।
- মাথা স্ফীত এবং মাথার ভিতরে টাটানি ব্যথার ন্যায় অনুভূতি।
Natrum Muriaticum
- মাথার ভিতর দপদপ করে।
- অন্ধ করে দেবার ন্যায় তীব্র মাথার বেদনা।
- যেন মনে হয় মাথার ভিতরে এক হাজার ছোট ছোট হাতুড়ি দিয়ে ঘা মারা হচ্ছে ।
- সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠার পরে।
- মাসিক ঋতুস্রাবের পরে।
- সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাথার বেদনা।
- মাথাটি অতিরিক্ত বড়ো হয়ে গেছে এই জাতীয় অনুভূতি হয়;শীতলতা।
- রক্তাল্পতা জনিত কারণে স্কুলে পড়া বালিকাদের মাথার যন্ত্রণা; স্নায়বিক, উৎসাহহীন, স্বাস্থ্য দুর্বল।
- পুরাতন মাথার যন্ত্রণা, আংশিকভাবে মাথার একপাশের বেদনা ।
- রক্তাধিক্যজনিত কারণে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, তৎসহ মুখমন্ডল ফ্যাকাশে ।
- বমিবমিভাব, বমি;নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাথার বেদনা ।
- চোখের পরিশ্রমের থেকে মাথার বেদনা ।
- বিপর্যস্ত ঋতুস্রাব ।
- ঠেটি দুটি, জিহ্বা ও নাকের অবসাদ ও সুড়সুড়ি।
- নিদ্রায় উপশম।
- কপালের অস্থিগহ্বরের প্রদাহ।
Natrum carb
- সূর্যের আলো থেকে মাইগ্রেনের মাথাব্যথার জন্য আরেকটি কার্যকরী ওষুধ ।
- সূর্য থেকে ডিহাইড্রেশনের ফলে রক্তনালীগুলি সঙ্কুচিত হয়, যা মাইগ্রেন হতে পারে।
- এই ধরনের ক্ষেত্রে সূর্যের সংস্পর্শে মাথাব্যথার সাথে ভার্টিগো দেখা দেয়।
- সামান্য মানসিক পরিশ্রমে, মাথার কণি , সূর্যের উত্তাপে এবং গ্যাসের আলোতে কাজ করলে বৃদ্ধি ।
- মাথাটি অতিরিক্ত বড়ো বলে মনে হয়।
- শ্রবন সম্পর্কিত অতিরিক্ত অনুভূতি প্রবণতা।
- গ্রীষ্মকালে মাথার বেদনা ফিরে আসে।
Bryonia
- মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, মূর্চ্ছা উঠে দাঁড়াবার সময়, মানসিক বিভ্রান্তি।
- ফেটে যাবার মত, দ্বিখণ্ডিত হবার মত মাথার যন্ত্রণা।
- মনে হয় যেন ভিতরে থাকা সবকিছুর চাপের দ্বারা ঠেলে বেরিয়ে আসবে, যেন ভিতর থেকে হাতুড়ি দিয়ে ঘা দেওয়া হচ্ছে, নড়াচড়ায়, ঝুঁকলে ও চোখ খুললে বৃদ্ধি।
- মাথার পিছনের অংশে যেন যন্ত্রণা বসে রয়েছে।
- জাইগোম্যাটিক প্রসেসের দিকে অস্থিগুলি যেন টেনে ধরে।
- মাথার যন্ত্রণা, নড়াচড়ায় বৃদ্ধি, এমনকি চোখের তারার নড়াচড়ায় পর্যন্ত বৃদ্ধি।
- কপাল অংশে মাথার যন্ত্রণা, ফ্রন্টাল সাইনাস আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
Spigelia
- বাম-পার্শ্বযুক্ত মাইগ্রেনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ।
- এটি নির্দেশিত হয় যখন মাথাব্যথা বাম টেম্পোরাল অঞ্চল, কপাল এবং চোখের উপরে অবস্থিত।
- দপদপ করে ব্যথা, তীব্র স্পন্দনযুক্ত ব্যথা।
- সূর্যোদয়ে শুরু হয়ে দুপুরে অত্যাধিক বাড়ে ও সূর্যাস্তে কমে যায় ।
- মাথার চারপাশে যেন শক্ত বন্ধনী দেয়া আছে চোখের নড়াচড়া এই ব্যথা আরও খারাপ করে।
Silicea
- মাইগ্রেনের জন্য একটি কার্যকর ওষুধ যখন ব্যথা ঘাড়ের পিছনে শুরু হয় এবং পুরো মাথার উপর ছড়িয়ে পড়ে, চোখের উপর প্রভাব ফেলে।
- মনে হয় মাথা ফেটে যেতে পারে।
- চোখ দিয়ে তীক্ষ্ণ ব্যথা হতে পারে, যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং মাথা ঘোরা হতে পারে, বিশেষ করে যখন উপরে তাকান।
- অ্যালকোহল সহ্য করতে পারে না।
- ব্যক্তি উদ্বিগ্ন এবং নার্ভাস বোধ করে এবং শব্দ বা ঠান্ডা বাতাস সহ্য করতে পারে না।
- স্বস্তির জন্য মাথার চারপাশে শক্ত কিছু বেঁধে রাখতে চান।
Kali Phos
- মাথার পিছনের অংশে বেদনা ।
- বিছানা থেকে উঠার পরে উপশম।
- মাথা ঘোরা, শুয়ে থাকলে, দাঁড়ালে, বসে থাকলে, এবং উপরের দিকে তাকালে।
- মস্তিষ্কের রক্তাল্পতা।
- ছাত্রদের মাথার যন্ত্রনা এবং অত্যধিক ক্লান্ত ব্যক্তিদের।
- মাথার যন্ত্রনা আস্তে আস্তে নড়াচড়ায় উপশম।
- মাথার যন্ত্রনা, তৎসহ পরিশ্রান্ত, পাকস্থলীর ভিতরে শুন্যবোধ।