মাঙ্কিপক্স ভাইরাস
এমপক্স বা মাঙ্কিপক্স কী?
মাঙ্কিপক্স ভাইরাস (MPV বা MPXV) হলো এমন একটি ভাইরাস যা মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে এই রোগ সৃষ্টি করে। এটি পক্সভাইরাডে পরিবারের অরথোপক্সভাইরাস গণের অন্তর্গত।
মানুষের অরথোপক্স ভাইরাসগুলির মধ্যে ভ্যারিওলা (VARV), কাউপক্স (CPX), এবং ভ্যাক্সিনিয়া (VACV) ভাইরাসও রয়েছে, তবে মাঙ্কিপক্স ভাইরাস যা স্মলপক্স সৃষ্টি করে।
মাঙ্কিপক্স রোগ গুটিবসন্তের মতো, তবে এটি সাধারণত হালকা ফুসকুড়ি এবং কম মৃত্যুহার ।
১৯৫৮ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে প্রেবেন ভন ম্যাগনাস প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত করেন, যা পরীক্ষাগারের প্রাণী হিসেবে ব্যবহৃত কাঁকড়া খাওয়া ম্যাকাক বানর (ম্যাকাকা ফ্যাসিকুলারিস) থেকে ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে একটি প্রাদুর্ভাব ঘটে যা আমদানি করা গাম্বিয়ান পাউচড ইঁদুর থেকে সংক্রামিত প্রেইরি কুকুরের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল।
মাঙ্কিপক্স ভাইরাস প্রাইমেট এবং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে এই রোগের কারণ হয়ে থাকে এবং এটি প্রধানত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্ট অঞ্চলে পাওয়া যায়।
মাঙ্কিপক্স ভাইরাস সংক্রমণ
মাঙ্কিপক্স ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষ এবং মানুষ থেকে মানুষ উভয়ভাবেই ছড়াতে পারে।
প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সাধারণত পশুর কামড় অথবা সংক্রামিত প্রাণীর শারীরিক তরলের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটে।
মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাসটি সংক্রামিত ব্যক্তির শারীরিক তরল থেকে ফোমাইটস (স্পর্শযোগ্য পৃষ্ঠ) এর মাধ্যমে অথবা ফোঁটা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে সংক্রমিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে। ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে ভঙ্গুর ত্বক, শ্বাসনালি, চোখ, নাক অথবা মুখের মাধ্যমে।
সম্প্রতি ধারণা করা হচ্ছে যে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সরাসরি সংস্পর্শে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা আগে বলা হয়নি।
এছাড়া, সংক্রমিত বানর, ইঁদুর, কাঠবিড়াল এবং ভাইরাসযুক্ত বস্তু যেমন বিছানাপত্র ও জামাকাপড়ের সংস্পর্শেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
মাঙ্কিপক্স এর লক্ষণ
মাঙ্কিপক্সের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- জ্বর
- মাথাব্যথা
- শরীর ঘেমে যাওয়া
- পেশী ব্যথা
- পিঠে ব্যথা
- মাংসপেশির টান
- অবসাদ
- জ্বর কমে গেলে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথমে মুখে ফুসকুড়ি দেখা যায়, পরে এটি অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে হাতের তালু এবং পায়ের তলায়।
- শরীরের অন্যান্য অংশে যেমন হাত, পা, বুক, যৌনাঙ্গ বা মলদ্বারে প্রদর্শিত ব্রণ বা ফোস্কার মতো দেখতে পারে।
মাঙ্কিপক্সের ঝুঁকির মধ্যে কারা রয়েছেন?
রোগের উপসর্গ নিয়ে থাকা ব্যক্তির স্বাস্থ্যকর্মী এবং পরিবারের সদস্যরা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা এখন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছেন।
শিশুদের ঝুঁকি বেশি কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল এবং পুষ্টির অভাব রয়েছে। এছাড়া, ঘনিষ্ঠভাবে খেলাধুলা করা শিশুরাও ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো গুটিবসন্তের টিকা না পাওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যদিও বয়স্করা কিছুটা সুরক্ষিত থাকতে পারে। গর্ভবতী নারীদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এড়াতে আক্রান্তদের থেকে দূরে থাকা এবং সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা জরুরি। আক্রান্তদের সব ক্ষত সেরে না ওঠা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন রাখা উচিত ।
মাঙ্কিপক্সের রোগের হোমিও চিকিৎসা
- প্রথমাবস্থায় উচ্চজ্বর, গায়ে ব্যথা ও দুর্বলতায়: Baptisia Q
- মাথার যন্ত্রণা, পিঠে তীব্র ব্যথা ও অস্থিরতায়: Cimicifuga 30
- প্রচণ্ড সর্দি কাশি থাকলে: প্রথমে Bryonia 30 ও পরে Antim Tart 30
- গুটিতে পুঁজ ও জ্বরে: Marc Sol 30
- মুখে লালা, গলা ক্ষত ও দুর্গন্ধ থাকলে: Marc Vivus 30
- মুখ ফোলা ও চুলকানি থাকলে: Sulphur 30 অথবা Apis Mel 30
- গুটি পচবার সময়: Arsenic Iod 30
- মুখে, গলায় ঘা ও ব্যথা থাকলে: Rhus Tox 30
- মামড়ি ওঠার সময়: Kali Sulph 30
- আরোগ্য অবস্থায় শরীরের অত্যন্ত দুর্বলতা নিবারণের জন্য: China 30
- আক্রান্ত অবস্থায় জ্বর থাকলে: বায়োকেমিক ওষুধ Ferrum Phos 6x ও Kali Mur 6x পর্যায়ক্রমে সেবন করুন।
- সুস্থ হওয়ার পর শরীর থেকে রস দূর করার জন্য: প্রায় ২-৩ মাস Rhus Tox 30 নিয়মিত সেবন করুন।
(বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।)
মাঙ্কিপক্স থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু পদক্ষেপ:
- আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে আসা এড়িয়ে চলা।
- আক্রান্ত ব্যক্তি ও সেবা প্রদানকারী উভয়ে মাস্ক ব্যবহার করা।
- নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া (৩০ সেকেন্ড ধরে)।
- আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সাবান, জীবাণুনাশক বা ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করা।
- বন্যপ্রাণী বা প্রাকৃতিক পোষক থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা, যেমন ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, খরগোশ। গৃহপালিত প্রাণী সাধারণত এই রোগ ছড়ায় না।
- আক্রান্ত অবস্থায় ঠাণ্ডা লাগানো যাবে না।
- উত্তেজক খাদ্য পরিহার করা উচিত।
- শরীরে চুলকানি হলে বিছানায় নিমপাতা ছড়িয়ে রাখুন এবং ফুসকুড়ি খোঁচাবেন না।
আফ্রিকার বাইরে ইউরোপ ও এশিয়াতে মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব
আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের পর এবার ইউরোপ ও এশিয়ায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে মাঙ্কিপক্স। এমপক্স নামে পরিচিত ভাইরাসটি সুইডেন এবং পাকিস্তানে শনাক্ত হয়েছে। সুইডেনের আক্রান্ত ব্যক্তি সম্প্রতি আফ্রিকার একটি অঞ্চলে ছিলেন, আর পাকিস্তানে আক্রান্ত তিনজন সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরেছেন।
পাকিস্তানে মাঙ্কিপক্সের কোনো ধরন নিশ্চিত হয়নি এখনও। সেলিম খান জানান, কোয়ারেন্টাইনে থাকা তিনজনের মধ্যে দুজনের দেহে ভাইরাস পাওয়া গেছে, অন্যজনের নমুনা ইসলামাবাদে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
মাঙ্কিপক্স ভাইরাস প্রথম ছড়ায় কঙ্গোতে, এরপর প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালে এমপক্সের মৃদু সংক্রমণের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। ভাইরাসটি পশু থেকে মানুষে এবং পরে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে।
মাঙ্কিপক্সের টিকা
মাঙ্কিপক্সের জন্য একটি টিকা রয়েছে, তবে এটি সাধারণত কেবল ঝুঁকিতে থাকা বা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা লোকদের জন্য উপলব্ধ।
টিকা পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব রয়েছে, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও জরুরি ব্যবহারের জন্য টিকা দেয়ার জন্য ডব্লিউএইচও নির্দেশনা দিয়েছে।
আফ্রিকার সিডিসি মহাদেশব্যাপী ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করেছে, যা চিকিৎসা সরবরাহ এবং সহায়তার প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মাঙ্কিপক্সের বৈশ্বিক বিস্তার প্রতিরোধের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে।