ডেঙ্গু জ্বর

ডেঙ্গু (DENV) ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি ভাইরাল সংক্রমণ যা এডিস মশা বাহিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ।
এডিস মশারা দিনের বেলা স্বক্রিয় থাকে এবং সন্ধ্যা নামার আগে মানুষকে কামড়ায়।
ডেঙ্গু ভাইরাস স্ত্রী এডিস মশার মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে।
গর্ভবতী মা থেকে শিশুতে এমনকি মা’র ভ্রূণে মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে শিশু জন্ম গ্রহণ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হতে পারে অথবা কম ওজনের শিশুর জন্ম হতে পারে।
এই মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়।
সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, পেশিতে ও গাঁটে ব্যথা এবং গাত্রচর্মে ফুসকুড়ি মত উপসর্গগুলো দেখা দেয়।
এই রোগের মারাত্মক রূপ নিতে পারে যাকে রক্তক্ষরী জ্বর বলে । এর ফলে রক্তপাত হয় এবং রক্ত অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় ।
অণুচক্রিকার উৎপাদন হয় অস্থিমজ্জায়।
প্লাটিলেট রক্ত জমাট বাঁধতে ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে।
প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দেয়।
ডেঙ্গু রোগে রক্ত সংক্রমণে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমতে পারে। প্লাটিলেট এক লাখের নীচে নেমে গেলে তাকে জটিল পরিস্থিতি হতে পারে ।
এসময় শরীরের যে কোনও জায়গা থেকে অনবরত রক্তপাত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকে।
এই রোগীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্লাটিলেট কমে যাওয়াই একমাত্র সমস্যা নয় বরং শরীরের রক্তরস কমে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়াও পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে।
এনএসওয়ান নামে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু হয়েছে কি না দ্রুত বোঝা যায়। জ্বর হওয়ার পাঁচদিনের মধ্যে এই পরীক্ষাটি করতে হয়।
ডেঙ্গু জ্বর অসুস্থ হলে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে এবং বেশি করে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।এই জ্বরের মারাত্মক রূপ ধারণ করলে রোগীকে রক্ত দিতে হতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা বাংলাদেশ সহ অন্যান্য মহাদেশের ১০০টির অধিক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। ১৭৭৯ সালে ডেঙ্গুর প্রথম ডেঙ্গুর ভাইরাস উৎস ও সংক্রমণ হয়েছিল।
এই এডিস মশারা বংশবিস্তারের উপযোগী বিভিন্ন স্থান, যেমন- কাপ, টব, টায়ার, ডাবের খোলস, গর্ত, ছাদ ও ভিবিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানি ইত্যাদিতে।
এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে আটকে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে।
এই এসিড মশক নিধন এবং সতর্কতাই বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
ডেঙ্গু মশা চেনার উপায়
ডেঙ্গু মশা দেখতে অন্যান্য মশার তুলনায় একটু আলাদা হয় ।
ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা খালি চোখে দেখে শনাক্ত করতে পারবেন । মশাটি আকারে একটু বড় হয়ে থাকে, ডেঙ্গু মশার দেহে ও পায়ে কালো এবং সাদা ডোরাকাটা দাগ রয়েছে।
এই ডেঙ্গু মশা অন্যান্য মশার মতো সব সময় সক্রিয় নয় এবং কেবল দিনের বেলায় কামড় দেয়। কামড়ানোর সময়কাল খুব ভোরে এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে ও সন্ধ্যায় ।
ডেঙ্গু জীবাণু বহনকারী মশার কামড়ে ব্যথা বা চুলকানি থাকে না।
এই এডিস মশা ৪০০ থেকে ৬০০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায়ও উড়ে বেড়াতে পারে।
ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ
একটা কথা জেনে রাখা দরকার , এডিস মশা কামড়ালেই মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয় না।
পরিবেশে উপস্থিত ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস যদি কোনো এডিস মশার মধ্যে সংক্রমিত হয়, শুধুমাত্র তখনই ওই মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
স্ত্রী এডিস মশা এই ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে। সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তিত মাঝে সংক্রমিত হয়ে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে ।
তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার কামড়ে এই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
হঠাৎ জ্বর ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হয়
জ্বরের সাথে মাথাব্যথা শুরু হয়
বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে
চোখের পেছনে ব্যথা, আলোতে তাকালে চোখের ব্যথা বেশি হয়
মুখ, দাঁত ও নাক দিয়ে রক্ত পড়ে
চামড়ায় লালচে দাগ (র্যাশ) ওঠে
শরীরে শীত শীত অনুভব করা
ক্ষুধা কমে যাওয়া
কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে
আবার কখনো ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হয়
স্বাদের পরিবর্তন বা খাওয়ায় অরুচি দেখা দেয়
হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে যায় এবং
মাংশ পেশিতে ও হাড়ে প্রচন্ড ব্যথা হয়
ডেঙ্গু রোগের প্রতিকার
ডেঙ্গু রোগে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
এডিস মশা দিনে কামড়ায়, তাই দিনের বেলায় ঘুমাতে গেলে ঘরে মশারি ব্যবহার করুন।
ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় মশার ওষুধ বা স্প্রে দিতে পারেন।
অফিস, ঘর এবং এর আশেপাশে ২-৩ দিন পানি না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অনেক সময় দেখা যায় , ফুলের টবে, এসি বা ফ্রিজের নিচের মতো স্থানে পানি জমে থাকে, এগুলো পরিষ্কার করতে হবে ।
শরীরে অস্বাভাবিক জোড় , দুর্বলতা, অসংলগ্ন কথা বলা, অনবরত বমি, তীব্র পেটে ব্যথা, গায়ে লাল ছোপ ছোপ দাগ, শ্বাসকষ্ট, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া অথবা রোগীর মুখ, নাক, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণ, পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্তবমি হলে- দেরি না করে, ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে, এমনকি বেশি খারাপ হলে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।
ডেঙ্গু রোগে বা রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তারের নির্দেশনা ছাড়া ঔষধ গ্রহণ করা উচিত নয় অথবা নিজে থেকে কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে অনেক সময় মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে ।
তাই , এই জ্বরে আক্রান্ত হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় প্রাথমিক পরিচর্যা ও চিকিৎসা শুরু করা ভালো।
জ্বর কমানোর জন্য গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মাথা, হাত, পা এবং শরীর মুছতে থাকুন অথবা হালকা নরমাল পানি দিয়ে গোসল করতে পারে ।
এই রোগীরা সাধারণত ক্লান্ত থাকেন, তাই তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া খুবই জরুরি।
এই রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত কোনো ভারী কাজ অথবা মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করা যাবে না।
ডেঙ্গু রোগীকে প্রচুর পরিমান প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার এছাড়া প্রচুর পরিমাণে পানি, স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি, ফলের রস, এবং দুধ জাতীয় তরল পানীয় খেতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে সচেতনতা তাই এডিস মশা যেন বংশবৃদ্ধি না করতে পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা খুবই জরুরি।
সচেতনতার মাধ্যমেই ডেঙ্গু জ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাপী বোঝা
সাম্প্রতিক দশকে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, WHO-তে রিপোর্ট করা কেস ২০০০ সালে ৫০৫৪৩০ কেস থেকে ২০১৯ সালে ৫.২ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে।
২০২৩ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক এই রোগের রেকর্ড করা হয়েছিল, যা WHO-এর সমস্ত অঞ্চলের ৮০ টিরও বেশি দেশকে প্রভাবিত করেছে। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ৭৩০০ টিরও বেশি ডেঙ্গু সংক্রান্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আফ্রিকা, আমেরিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১০০ টিরও বেশি দেশে এই রোগটি এখন স্থানীয়। আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলি সবচেয়ে গুরুতরভাবে প্রভাবিত, এশিয়া বিশ্বব্যাপী রোগের বোঝার প্রায় ৭০% প্রতিনিধিত্ব করে।
ডেঙ্গু ইউরোপ, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণ আমেরিকার নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ।
সাধারণ প্রশ্নঃ –
ডেঙ্গু জ্বর হলে কি ভাবে বুঝতে পারবো?
সাধারণত ডেঙ্গুতে আগে জ্বর আসে, শিশুর শরীর দুর্বল হয়ে যায়, খেতে পারে না, গা-হাত-পা ব্যথা করে। ডেঙ্গু হলে শুরুতেই ঠান্ডা-সর্দি-কাশি থাকে না। প্রথমে প্রচণ্ড জ্বর হবে, ১০৪-১০৫ ডিগ্রির মতো হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর হলে কি কি খাবার খেতে হবে?
প্রচুর পরিমাণে পানি, স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি, ফলের রস, এবং দুধ জাতীয় তরল পানীয় খেতে হবে।
ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া খাবার, দুধ–চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক, অতিরিক্ত শক্ত খাবার ইত্যাদি পরিহার করা উচিত।
ডেঙ্গু টেস্ট কত দিনের মধ্যে করতে হয়?
ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট হলো এনএসওয়ান। এই টেস্ট জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করলে টেস্টের রেজাল্ট ভুল আসে। তাই চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, টেস্টের রিপোর্ট যাতে শতভাগ নির্ভুলের জন্য জ্বরের ২ থেকে ৪ দিনের মধ্যে এ টেস্ট করতে হবে।
ডেঙ্গু সুস্থ হতে কতদিন লাগে?
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশিরভাগ লোকের উপসর্গ থাকবে না। কিন্তু যারা করেন তাদের জন্য সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হল উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ফুসকুড়ি। বেশিরভাগই ১-২ সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে। কিছু লোক গুরুতর এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
জ্বর হলে কি প্লাটিলেট কমে যায়?
ডেঙ্গু জ্বরে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যায় কারণ এটি অস্থি মজ্জাকে দমন করে । এই জ্বরে প্লেটলেটের সংখ্যা হ্রাস পায় কারণ রক্তের কোষগুলি ভাইরাস দ্বারা প্রভাবিত হয় যা প্লেটলেটের ক্ষতি করে।
ডেঙ্গু হলে কতদিন পর পর প্লেটলেট পরীক্ষা করা উচিত?
তাই সাধারণ ভাবে জ্বর আসার পাঁচ দিন পর এই প্লেটলেট টেস্ট করতে দেন চিকিৎসকরা।