শরীরের টিউমারগুলো ক্যান্সারাস প্রকৃতির নয় তো !

টিউমার কি ?
টিউমার ইংরেজি শব্দ, এর বাংলা নাম আর্বুদ । শরীরের যে কোনো স্থানে কোষসমূহ যদি ধীরে ধীরে বা দ্রুততার সঙ্গে অস্বাভাবিক ও অসামঞ্জস্যভাবে ফুলে ওঠে অথবা এক কথায় টিউমার বা আর্বুদ হলো মূল দেহ কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
শরীরের টিউমার কোষগুলি বৃদ্ধি পায় এবং নতুন কোষে বিভক্ত হয়, যখন কোষ পুরানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা মারা যায় এবং নতুন কোষ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এটি একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া । ক্যান্সারসহ অন্যান্য কিছু টিউমারের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। শরীরের প্রয়োজন না থাকা সত্বেও টিউমার কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে এবং স্বাভাবিক কোষের মত তারা মারা যায়না ফলে পিণ্ডের সাথে কোষ বাড়তে বাড়তে টিউমার বড় আকৃতিতে রূপ নেয়।
টিউমার তিন প্রকার :
১. হিস্টোমা বা কানেকটিভ টিস্যু, ২. সাইটোমা এবং ৩. টেরাটোমা ।
হিস্টোমা টিউমার আবার দুই প্রকার : (ক). বিনাইন ও (খ). ম্যালিগন্যান্ট।
ক). বিনাইন টিউমার:
এক ধরনের টিউমার শরীরের এক জায়গাতেই শুধু বেড়ে ওঠে। এদের বলে বিনাইন টিউমার। এমন আর্বুদ তেমন ক্ষতিকারক নয়।
এ জাতীয় টিউমার তুলতুলে নরম হয় এবং শক্ত হয় না। খুব আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায়। এর কোনো আবরণ থাকে না। এর উপরের চর্ম আলাদা পৃথক মনে হয়। এ টিউমারের সংলগ্ন গ্রন্থিসমূহ আক্রান্ত হয় না। চাপ দিলে এতে কোনো যন্ত্রণা অনুভূত হয় না।
সাধারণত ডিম্বাকৃতি বা গোলাকৃতির হয়, চামড়ার রঙ্গয়ের তেমন কোন পরিবর্তন হয়না, এদিক ওদিক সরে যায়, সুস্পষ্ট মার্জিন থাকে।
এরা নন-ক্যন্সারাস টিউমার, এধরণের আর্বুদ কোষগুলো তার প্বার্শবর্তী স্বাভাবিক টিস্যু ভেদ করে অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পরেনা। এদের বৃদ্ধি খুব ধীর গতিতে হয় কোন কোন ক্ষেত্রে তা বৃদ্ধি হয়না বলেই মনে হয়। অধিকাংশ বিনাইন টিউমার দেহের তেমন ক্ষতি করে না তবে টিউমারের কারনে স্নায়ু ও রক্তনালীতে চাপ পরলে বা অতিরুক্ত পরিমাণ হরমোন সিক্রেশন হলে ব্যাথা সহ আরো কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বিনাইন টিউমারের উৎপত্তি ঘটে শরীরের যেকোনো স্থানে আঘাত লাগা, প্রদাহ, সংক্রমণ, জীবনযাত্রা, জেনেটিক অর্থাৎ জিনগত এবং বিকিরণের সংস্পর্শের মাধ্যমে।
কিছু বিনাইন টিউমার হল- এডিনোমা, ফাইব্রোমা বা ফাইব্রোয়েড, হেমাঞ্জিওমা ও লাইপোমা।
এডিনোমাঃ এটি গ্ল্যান্ডুলার এপিথেলিয়াল টিস্যুর ভিতর হয়। যেমন- সবচেয়ে কমন স্তন টিউমার ফাইব্রোএডিনোমা, কোলনের পলিপাস, হেপাটিক এডিনোমা(লিভার টিউমার) ইত্যাদি।
ফাইব্রোমা বা ফাইব্রোয়েডঃ শরীরের যেকোন স্থানের ফাইব্রাস টিস্যুতে এটি হতে পারে। যেমন- সবচেয়ে কমন জরায়ু টিউমার ।
হেমাঞ্জিওমাঃ রক্তনালিকাগুলো অতিরুক্ত পরিমানে বৃদ্ধির ফলে এই আর্বুদ হয়। কিছু কিছু নবজাতকের হেমাঞ্জিওমা দেখা যায়, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনা আপনি ভাল হয়ে যায়। তবে চিকিৎসা নিলে অপেক্ষাকৃত শীঘ্র এ সমস্যা দূর হয়।
লাইপোমাঃ লাইপোমা একধরনের নরম টিস্যু আর্বুদ যার ভিতরে ফ্যাটি কোষ থাকে।
খ). ম্যালিগন্যান্ট টিউমার :
সাধারণত নির্দিষ্ট আকৃতিবিহীন, শক্ত, এদিক ওদিক সরে যায়না, অস্পষ্ট ও অনিয়মিত মার্জিন থাকে।
এটা খুব দ্রুত বড় হয়। এতে আবরণ থাকে।এটার উপরের চর্ম আলাদা পৃথক মনে হয় না। এ টিউমার সংলগ্ন গ্রন্থিসমূহ আক্রান্ত হয়। চাপ দিলে এতে যন্ত্রণা অনুভূত হয়।এতে আঘাত করলে বা অস্ত্রোপচার করলে ক্ষতি হয়। অস্ত্রোপচার করলে পরে প্রায়ই ক্যান্সার হতে দেখা যায়।
এধরণের টিউমারগুলো ক্যান্সারাস প্রকৃতির। এর কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিকভাবে বিভক্ত হয়ে প্রায়ই পার্শ্ববর্তী স্বাভাবিক কোষগুলোতে ছড়িয়ে পরে এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে বিস্তার লাভ করে। এই ছড়িয়ে পড়াকে মেটাস্টেসিস বলে।
ম্যালিগন্যান্ট টিউমারগুলোর মধ্যে আছে- কার্সিনোমা, সারকোমা, জার্ম সেল টিউমার, ব্লাস্টোমা।
কার্সিনোমাঃ এটি সবচেয়ে কমন ম্যালিগন্যান্ট আর্বুদ। এপিথেলিয়াল কোষে এটি হয় তাই পাকস্থলী, প্রোস্টেট, প্যানক্রিয়াস, লিভার, কোলন, ব্রেস্ট, শ্বাসযন্ত্র ইত্যাদি স্থানে সচরাচর এ টিউমার হয়।
সারকোমাঃ এটি তরুণাস্থি(কার্টিলেজ), হাড়(বোন), ফ্যাট, স্নায়ু(নার্ভ)ইত্যাদি সংযোজক টিস্যুতে শুরু হয়। অধিকাংশ সারকোমা ম্যালিগন্যান্ট।
জার্ম সেল টিউমারঃ স্পার্ম ও ওভাম উৎপাদনকারী কোষে এ টিউমার সৃষ্টি হয় ফলে অন্ডকোষ ও ওভারিতে এ আর্বুদ দেখা যায়।
ব্লাস্টোমাঃ এধরণের আর্বুদ এব্রায়োনিক টিস্যু থেকে উৎপন্ন হয়। তাই বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের এ টিউমার বেশি হয়।
টিউমারের চিকিৎসাঃ
এলোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিনাইন টিউমারের জন্য সাধারণত সার্জিক্যাল পদ্ধতিটি সবচেয়ে সহজ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, টিউমারের আকৃতি ও অবস্থানের প্রতিকূলতার কথা বিবেচনা করে বিনাইন আর্বুদ চিকিৎসায় সার্জারি এড়িয়ে চলা হয়।
অন্য দিকে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও সার্জারির সাহায্য গ্রহণ করা হয়। তবে উপরোক্ত পদ্ধতিগুলোর প্রত্যেকটি রোগীর জন্য খুব অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক ও অত্যান্ত ব্যায়বহুল।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাঃ
টিউমার চিকিৎসায় এলোপ্যাথিক পদ্ধতির কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি কিংবা সার্জারি ব্যায়বহুল হওয়ায় ও পরবর্তীতে নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় সারা প্রথিবীব্যপী টিউমার চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি একটি অত্যান্ত জনপ্রিয় ও নিরাপদ চিকিৎসা ব্যাবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় এ রোগের জন্য রোগীকে দীর্ঘদিন অত্যান্ত ধৈর্য্য সহকারে নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় বিনাইন টিউমার প্রায়ই আরোগ্য হচ্ছে এবং ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের রোগীও অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি আরোগ্য না হলেও রোগ অনেকটা উপশমিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই রোগীর অবস্থা খুব বেশি খারাপ না হলে, সময় একটু বেশি লাগলেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিলে রোগীর শারীরিক অন্যান্য ঝুঁকি অনেক কম হয়, যা রোগীকে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে বাকী জীবন কাটানোর নিশ্চয়তা দান করে।
হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামের উপর ভিত্তি করে কোন চিকিৎসা হয় না বরং প্রত্যেকটি রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র নির্নয় করে ঔষধ নির্বাচন করে চিকিৎসা করা হয়। সেক্ষেত্রে একই রোগে আলাদা আলাদা ব্যক্তিতে আলাদা আলাদা ঔষধ নির্বাচন হতে পারে, তবে রোগ ও রোগী আলাদা হলেও সার্বিক লক্ষণ বিচার বিশ্লেষণ করে সঠিক ঔষধটি হোমিওপ্যাথিক নিয়মনীতি মেনে প্রয়োগ করলে যেকোন ধরণের টিউমার আরোগ্য করা সম্ভব।
টিউমারের হোমিওপ্যাথিক ঔষধ :
টিউমারের চিকিৎসায় যে সব হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবহার হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল :-
১. ব্যারাইটা কার্ব (Baryta Carbonica),
২. ক্যালকেরিয়া কার্ব (Calceria Carb),
৩. ক্যালকেরিয়া ফ্লোর (Calcarea fluor),
৪. সিস্টাস ক্যান (Sistas can),
৫. কোনিয়াম (conium),
৬. গ্রাফাইটিস (Graphites),
৭. হেক্লালাভা (Hecla lava),
৮. লাইকো (lycopodium),
৯. থুজা (Thuja),
১০. আর্সেনিক এল্ব (Arsenicum Album),
১১. কার্ব এনিমেলিস (Carbo Animalis),
১২. হাইড্রাসটিস (Hydrastis),
১৩. আয়োডিয়াম (Iodium),
১৪. অরাম মিউর ন্যাট (Aurum Muriaticum Natronatum),
১৫. অর্নিথোগেলাম (Ornithogalum),
১৬. ফাইটোলাক্কা (Phytolacca),
১৭. সাইলিসিয়া (Silicea),
১৮. সিম্ফাইটাম (Symphytum),
১৯। ইথুজা (Ethuja),
২০. ফসফোরাস (Phosphorus),
২১. বেলিস পার (Bellis Perennis),
২২. রুটা (Ruta Graveolens),
২৩. ক্যাল ফস (Calcarea Phos), ইত্যাদি।
তাছাড়া R17 Drops – টিউমার চিকিৎসায় কার্যক ।
লক্ষণানুসারে অন্য যেকোনো হোমিও ঔষধ হতে পারে । কেননা হোমিও চিকিৎসা লক্ষণের উপর, রোগের উপর নায় ।
টিউমার হওয়ার কারণ
আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সমস্যা হলেও টিউমার হতে পারে। অন্যান্য পরিবেশগত পদার্থের তুলনায় তামাক আর্বুদ বা ক্যান্সারের ঝুঁকি ও মৃত্যু বৃদ্ধি করে। টিউমারের অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:-
- বেনজিন এবং অন্যান্য রাসায়নিক এবং বিষাক্ত পদার্থ
- অত্যধিক অ্যালকোহল পান করা
- পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ যেমন বিষাক্ত মাশরুম, আফ্লাটক্সিন নামক বিষ যা চিনাবাদাম গাছে জন্মাতে পারে
- অত্যাধিক সূর্যালোক
- জেনেটিক সমস্যা
- রেডিয়েশন
- বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণ
টিউমার প্রতিরোধ করার উপায়:
টিউমারের চিকিৎসা বলতে অপারেশন, কেমোথেরাপি বা এই ধরণের উন্নত চিকিৎসা, যেগুলো যথেষ্ট জটিল, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাই আর্বুদ ভালো করার উপায় বলতে আপনাকে এটি প্রতিরোধ করতে হবে। যে সমস্ত বিষয়গুলো মেনে চলার মাধ্যমে আপনি টিউমার প্রতিরোধ করতে পারবেন তা হলো-
১) তামাক সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন, কারণ তামাক টিউমারের ঝুঁকি খুব বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি করে।
২) স্বাস্থ্যকর খাবার খান, যদিও এটি আপনার টিউমার প্রতিরোধের গ্যারান্টি দিতে পারে না, তবে বিভিন্ন ফল এবং স্বাস্থ্যকর সবজিগুলো টিউমারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
৩) একটি সুস্থ ওজন বজায় রাখুন এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন, কায়িক শ্রম টিউমার প্রতিরোধে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৪) সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি বেশ ক্ষতিকর এবং টিউমারের অন্যতম কারণ হতে পারে, তাই অতিরিক্ত সূর্যালোক থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।
৫) হেপাটাইটিস বি লিভারে ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) বিভিন্ন যৌনাঙ্গের ক্যান্সারের জন্য দ্বায়ী। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে এই সমস্ত রোগ থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি এই সম্পর্কিত আর্বুদ বা ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে যায়।
৬) নিরাপদ যৌন অভ্যাস বজায় রাখুন, কারণ অনিয়ন্ত্রিত যৌন মিলনের ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং টিউমারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৭) নিজের দিকে লক্ষ্য রাখুন এবং নিয়মিত ডাক্তারের সাথে কথা বলে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যামুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।