কষ্টিকাম (CAUSTICUM)
অপর নাম – কষ্টিক পটাশ (Caustic potash)
কষ্টিক পটাশ হ্যানিম্যান কর্তৃক পরীক্ষিত একটি অদ্বিতীয় ঔষধ, যা সোরাদোষঘ্ন ঔষধসমূহের মধ্যে তালিকাভুক্ত। এর রাসায়নিক গঠন সঠিকভাবে জানা না গেলেও, এটি একটি পটাশিয়ামের যৌগ হিসেবে ধারণা করা হয়।
কষ্টিক পটাশ তৈরির জন্য কষ্টিক লাইম এবং বাই সালফেট অফ পটাশ মিশ্রিত করা হয়। এর প্রথম থেকে তৃতীয় দশমিক ক্রম জল মিশ্রিত অ্যালকোহলে তৈরি হয়, এবং পরবর্তী ক্রমে অ্যালকোহলে প্রস্তুত করা হয়।
কষ্টিকামের বিশেষ কার্যকারিতা:
- পুরাতন বাত রোগ এবং পক্ষাঘাত: কষ্টিকাম পুরাতন বাত রোগ (arthritis) এবং বিশেষত সন্ধি বাত এবং পক্ষাঘাত সংক্রান্ত উপসর্গের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। এই ঔষধটি এমন রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী যারা দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রণা বা দুর্বলতায় ভুগছেন এবং তাদের পেশী বা স্নায়ুর শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
- পেশীতে যন্ত্রণা এবং ফাইব্রাস তন্তুতে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো বেদনা: পেশীতে টেনে ধরার মতো বা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো বেদনা কষ্টিকামের সাধারণ লক্ষণ। বিশেষ করে ফাইব্রাস তন্তু, যেটি পেশী বা স্নায়ু সংযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সেখানে এই ধরনের বেদনা লক্ষ করা যায়। এই যন্ত্রণার সাথে পেশী শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়া এবং পেশী সঙ্কুচিত হওয়া (muscle contracture) দেখা দেয়।
- বয়সের মতো স্বাস্থ্য ভেঙে যাওয়া: কষ্টিকাম রোগীর শরীরে বার্ধক্যের মতো ধীরগতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা সৃষ্টি করে, যেখানে পেশীর শক্তি কমতে থাকে এবং শারীরিক গঠন ভেঙে যায়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী দুর্বলতার সৃষ্টি করে, যা সময়ের সাথে আরও বাড়তে থাকে।
- শ্বাসনালীর সর্দিজনিত অবস্থা: শ্বাসনালীর সর্দি, শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসজনিত সমস্যায় কষ্টিকাম কার্যকরী হতে পারে। বিশেষ করে কালো, দৃঢ় পেশীবহুল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি ভালো কাজ করে।
- রাত্রে অস্থিরতা এবং অস্থিতে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো বেদনা: কষ্টিকাম রোগী সাধারণত রাত্রে শারীরিক অস্থিরতায় ভোগে। বিশেষত, সন্ধিস্থলে (joint) এবং অস্থিতে (bone) ছিঁড়ে যাওয়ার মতো বেদনা অনুভূত হয়। এটি সেই ধরনের ব্যথা যা শান্তি এবং স্থিতি পেতে কঠিন হয়ে ওঠে। এ ধরনের ব্যথা যখন এক জায়গায় স্থায়ী হয়, তখন তা মূর্চ্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করতে পারে, যার ফলে দেহের শক্তি কমে গিয়ে রোগী দুর্বল হয়ে পড়ে।
- পক্ষাঘাতের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা: কষ্টিকামের রোগীরা এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন যেখানে পক্ষাঘাত হতে পারে। শুরুতে এটি সাধারণ দুর্বলতা হিসেবে অনুভূত হয়, তবে ধীরে ধীরে স্থানিক পক্ষাঘাত (যেমন মুখমণ্ডল, চোখের পাতা, জিহ্বা, গলাধঃকরণ পেশী, প্রস্রাব থলি ইত্যাদির পক্ষাঘাত) হতে পারে। এটি শিশুদের দেরিতে হাঁটা শেখা বা স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা থেকেও হতে পারে।
- চর্মের মলিনতা ও আঁচিল: কষ্টিকামের রোগীদের চর্ম সাধারণত মলিন, সাদাটে হয়ে থাকে এবং বিশেষত মুখমণ্ডলে আঁচিল হতে পারে। এর পাশাপাশি, রোগের কারণে শীর্ণতা এবং দুশ্চিন্তা থেকে শীর্ণতা দেখা দিতে পারে, যা দীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকে।
- ব্যথা এবং টাটানি: কষ্টিকাম রোগীদের মধ্যে জ্বালাকর, ক্ষতবৎ এবং টাটানি ধরনের ব্যথা থাকে, যা বেশিরভাগ সময়ে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। এই ধরনের ব্যথা বিশেষত স্নায়ু বা পেশীর সমস্যাগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কষ্টিকামের কষ্টিক পটাশের মূল বৈশিষ্ট্য:
১. অতিশয় দুর্বলতা: কষ্টিক পটাশের অন্যতম লক্ষণ হলো অতিরিক্ত দুর্বলতা, যা মূর্চ্ছা বা অবসন্নতার মতো অনুভূতি দেয়। ধীরে ধীরে এই দুর্বলতা স্থানিক পক্ষাঘাতে পরিণত হয়, যেমন স্বরযন্ত্র, জিহ্বা, গলাধঃকরণ পেশী, চোখের পাতা, মুখমণ্ডল, মূত্রাশয়, হাত-পা পর্যন্ত পক্ষাঘাত হতে দেখা যায়।
২. দুরারোগ্য স্নায়ুশূল: বিশেষত সোরাদোষ থেকে স্নায়ুশূলের উৎপত্তি হয়, যা খাল ধরার মতো বা টেনে ধরার মতো বেদনা সৃষ্টি করে।
৩. স্পর্শাদ্বেষ ও টাটানো অনুভূতি: শরীরের বিভিন্ন অংশে, যেমন করোটি, গলা, কণ্ঠনালী, বুকে, সরলান্ত্র, মলদ্বারে ও মূত্রমার্গে, জ্বালা এবং টাটানো অনুভূতি হতে পারে, যা অনেক সময় ছাল উঠানোর মতো অনুভূতি তৈরি করে।
৪. বন্ধনী সমূহের সঙ্কোচন: আরথাইটিক ডিফরম্যান্স বা বাতজনিত অঙ্গবিকৃতি দেখা দিতে পারে।
৫. শুকনো কাশি ও মূত্রনিঃসরণ: শুকনো কাশি, কুচকিতে বেদনা এবং অনৈচ্ছিক মূত্রনিঃসরণও কষ্টিক পটাশের সাধারণ লক্ষণ। শ্বাসকষ্ট ও গলা টাটানোর মতো অনুভূতি থাকে, যা ঠাণ্ডা জল পান করলে উপশম হয়।
৬. কোষ্ঠবদ্ধতা: কষ্টিক পটাশে কোষ্ঠবদ্ধতা এবং বারবার মলত্যাগের প্রবৃত্তি দেখা যায়। দাঁড়িয়ে মলত্যাগ করলে তুলনামূলকভাবে ভাল হয়।
৭. আবহাওয়ার প্রভাব: শুষ্ক আবহাওয়ায় কষ্ট বেড়ে যায়, তবে আর্দ্র আবহাওয়ায় ঠাণ্ডা জলপানে উপশম হয়।
কষ্টিকামের আলোচনা
কষ্টিক পটাশের অনেক অসাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যা খুবই নির্ভরযোগ্য।
দুর্বলতা: কষ্টিক পটাশে অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা যায়, যা পটাশিয়াম লবণের মূল লক্ষণ। এর মাধ্যমে ক্রমে পক্ষাঘাত এবং স্নায়ুবিক স্পন্দন, কোরিয়া, আক্ষেপ, এবং মৃগী রোগ সৃষ্টি হতে পারে। কষ্টিক পটাশে পক্ষাঘাত সাধারণত দেহের ডানদিকে হয় (ল্যাকেসিসের ক্ষেত্রে বাঁদিকে হয়)।
স্নায়ু সংক্রান্ত পীড়া (Neuralgia): কষ্টিক পটাশে স্নায়ু পীড়া সাধারণত দুর্দম প্রকৃতির হয়ে থাকে। অন্যান্য ঔষধগুলি ব্যর্থ হলে কষ্টিক পটাশে উপকার পাওয়া যায়।
মানসিক লক্ষণ: কষ্টিক পটাশে বিষাদ, বিমর্ষতা, আশাশূন্যতা এবং দীর্ঘস্থায়ী শোক বা দুঃখ থেকে উৎপন্ন মনোবিকারের লক্ষণ দেখা যায়, যা ইগ্নেসিয়া, নেট্রাম মিউরিয়েটিকাম এবং ফসফরিক অ্যাসিডের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
চোখ ও কান:
কষ্টিক পটাশে চোখের সামনে ঝিলিমিলি বা মেঘের মতো দেখতে হতে পারে, যা ছানি পড়ার পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়। কানে শোঁ শোঁ শব্দ, ঠুন ঠুন, ঠং ঠং, গুন গুন ইত্যাদি শব্ধ শুনতে পাওয়া কষ্টিক পটাশের একটি বিশেষ লক্ষণ।
মুখমণ্ডল:
মুখমণ্ডল হরিদ্রাবর্ণ হতে পারে (যা জন্ডিস নয়), বাত বা সোরাদোষজনিত পক্ষাঘাত এবং মুখমণ্ডলের স্নায়ুশূলও দেখা যায়। চোয়ালের আড়ষ্টতা (stiffness of the jaws) এবং মুখ খুলতে না পারাও কষ্টিক পটাশের লক্ষণ।
জিহ্বা ও গলাধঃকরণ:
জিহ্বার পক্ষাঘাত এবং অস্পষ্ট বাক্য উচ্চারণ কষ্টিক পটাশে দেখা যায়। গলার মধ্যে শুকনো কাশি, টাটানো এবং ছাল উঠে যাওয়ার অনুভূতি থাকে।
পরিপাকতন্ত্র:
পাকস্থলীতে চুন পোড়ানোর মতো অনুভূতি এবং বাতোদগার দেখা দেয়। কষ্টিক পটাশে মলদ্বারে উপসর্গ, যেমন কোষ্ঠবদ্ধতা, নিস্ফল মলত্যাগের প্রবৃত্তি, মলদ্বারে টান পড়া, এবং অর্শের সমস্যাও দেখা যায়।
মূত্রযন্ত্র:
কষ্টিক পটাশে মূত্রাশয়ের কার্যক্রমেও কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন, মূত্রমার্গের মুখে চুলকানি, অবিরত নিস্ফল মূত্রবেগ, এবং মূত্রপাতের সময় ফোঁটা ফোঁটা মূত্রপাত।
শ্বাসযন্ত্র:
কষ্টিক পটাশে শ্বাসযন্ত্রেও লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, প্রাতঃকালে স্বরভঙ্গের বৃদ্ধি, শুকনো কাশি, এবং গলাধঃকরণে টাটানো ও ছাল উঠে যাওয়ার অনুভূতি থাকে।
হাত–পা ও পিঠ:
কষ্টিক পটাশে পিঠ, হাত, পা ও কোমরে আড়ষ্টতা, পেশীর দুর্বলতা, টান ধরা এবং হাঁটতে কষ্ট হওয়া দেখা যায়।
চর্মরোগ:
কষ্টিক পটাশ খোসপাচড়া বা একজিমা ধরনের চর্মরোগে কার্যকরী।
কষ্টিক পটাশ একটি অত্যন্ত কার্যকরী ঔষধ, যা নানা ধরনের রোগে উপকারী, বিশেষত স্নায়ু, পরিপাকতন্ত্র এবং মূত্রাশয়ের সমস্যাগুলিতে।
কষ্টিকামের সঙ্গে সম্পর্কিত সতর্কতাগুলি:
- ফসফরাসের সঙ্গে সম্পর্ক:
কষ্টিকাম এবং ফসফরাস কখনই একে অপরের পরবর্তী ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়। এই দুই ঔষধের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক সম্পর্ক রয়েছে, অর্থাৎ, একটি ঔষধ ব্যবহারের পর অন্যটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। - প্রতিবন্ধক অবস্থার জন্য:
সীসা (Lead) থেকে উদ্ভূত পক্ষাঘাতের ক্ষেত্রে কষ্টিকাম উপকারী হতে পারে। এটি স্নায়ু বা পেশীতে পক্ষাঘাত সৃষ্টি হওয়া সমস্যার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। - পূরক ঔষধ:
কষ্টিকামের সঙ্গে কার্বোভেজ পূরক ঔষধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি কষ্টিকামের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। - তুলনীয় ঔষধ:
কষ্টিকামের কিছু তুলনীয় ঔষধের মধ্যে রাসটক্স (Rhus tox), আর্সেনিক (Arsenicum album), এবং এমন ফস (Mucous membrane paralysis of face) উল্লেখযোগ্য। এই ঔষধগুলির লক্ষণ ও কার্যক্রম কষ্টিকামের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য রাখে, বিশেষত মুখমণ্ডলের পক্ষাঘাতের ক্ষেত্রে। - সঠিক আবহাওয়া:
কষ্টিকামের প্রভাব সাধারণত শুষ্ক, ঠান্ডা, পরিষ্কার আবহাওয়ায় বাড়ে এবং ঠান্ডা বাতাসে খারাপ হতে পারে। গাড়িতে চলার সময়ও এর প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর বিপরীতে, ভিজে বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, গরম স্থান (যেমন বিছানার গরম) কষ্টিকামের লক্ষণগুলিকে উপশম করতে সাহায্য করে।
কষ্টিকামের শক্তি:
- কষ্টিকাম সাধারণত ৩য় থেকে ৩০ শক্তি পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়।
- পুরানো রোগের ক্ষেত্রে, বিশেষত পক্ষাঘাত বা স্নায়ু সমস্যা থাকলে, উচ্চতর শক্তি (যেমন ২০০ শক্তি) ব্যবহার করা হতে পারে, তবে তা সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে একবার ব্যবহার করা উচিত, কারণ এই শক্তিগুলির ক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী এবং ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
উপশম ও বৃদ্ধি:
- বৃদ্ধি: শুষ্ক, ঠান্ডা, পরিষ্কার আবহাওয়ায় কষ্টিকামের লক্ষণগুলি বৃদ্ধি পায়। এই সময় গাড়িতে চললে বা ঠান্ডা বাতাসে থাকলে অসুবিধা হতে পারে।
- উপশম: ভিজে, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় বা উত্তাপে কষ্টিকামের লক্ষণগুলি উপশম হতে পারে। গরম বিছানায় বা গরম আবহাওয়ায় এটি প্রশমিত হয়।
বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।
( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )