Arsenic Album (আর্সেনিক এলবাম)
অপর নাম: হোয়াইট আর্সেনিকাম (White Arsenicum)
আর্সেনিয়াস অ্যাসিড (Arsenious Acid)
সেঁকোবিষ, শঙ্খ-বিষ।
আর্সেনিকের মতো অস্থিরতা অন্য কোন ঔষধে দেখা যায় না। যদিও অস্থিরতা একোনাইটেরও লক্ষণ, একোনাইট সাধারণত প্রাদাহিক রোগের প্রথম পর্যায়ে তীব্র জ্বরের সাথে এই অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
অপরদিকে, আর্সেনিকের অস্থিরতা দেখা যায় রোগের শেষ পর্যায়ে, যখন রোগীর শক্তি অনেকটাই কমে যায় বা টাইফয়েডের জ্বরের নিস্তেজ অবস্থায় থাকে।
একোনাইটের রোগী ভয়ে ও যন্ত্রণায় এদিক-ওদিক গড়াগড়ি দেয়, কিন্তু আর্সেনিকের রোগী গড়াগড়ি করতে চাইলেও দুর্বলতার কারণে তা করতে পারে না।
আর্সেনিক এলবাম রোগী নিজে ইচ্ছানুসারে নড়াচড়া করতে পারে না, তবে তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক বিছানা থেকে অন্য বিছানায় স্থানান্তরিত করতে বলা হয়। নিজে চেষ্টা করলে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এই রোগীর মৃত্যু ভয় থাকে, তবে একোনাইটের মতো তীব্র মৃত্যুভয় অনুভূত হয় না। আর্সেনিক রোগীর উৎকণ্ঠা থাকে, বিশেষ করে মনে হয় যে, তার রোগ আর ভালো হবে না এবং সে ঔষধ খেয়েও কিছু করতে পারবে না—এমন চিন্তায় থাকে।
এছাড়াও, আর্সেনিক এলবাম রোগী প্রায়ই উৎকণ্ঠার কারণে রাতের বেলা বিছানা থেকে উঠে পড়তে চায়, এবং কোনো বেদনা না থাকা সত্ত্বেও ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে চায়। যদি শক্তি থাকে, তবে হাঁটতে চায়। এটি সাধারণতঃ রোগীর স্থির থাকতে না পারার কারণে ঘটে।
যদি আর্সেনিক এলবাম এই ঔষধটি সঠিক রোগীর জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে প্রথমে রোগীর উদ্বেগ কমতে শুরু করে এবং রোগী স্থিরভাবে শুয়ে থাকতে পারে।
বেদনা যদি কম না-ও হয়, তবে রোগীর অস্থিরতা কমে যায় এবং পূর্বের তুলনায় সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
তাহলে, যদি রোগীর মধ্যে অবিচলিত অস্থিরতা এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা থাকে, তাহলে আর্সেনিক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কখনও ভুলবেন না।
আর্সেনিক এলবামের চরিত্রগত লক্ষণ:-
- শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা, রোগের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অস্থিরতা বজায় থাকে।
- রোগের কারণে মৃত্যুভয় এবং ক্যানসার হওয়ার আতঙ্ক থাকে।
- আক্রান্ত স্থানে উত্তাপ প্রয়োগ করলে জ্বালা এবং ব্যথা কমে যায়, কিন্তু মাথায় ঠান্ডা পানি দিলে উপশম হয়।
- অত্যধিক পিপাসা থাকে, তবে বার বার অল্প পরিমাণে পানি পান করা হয়; পুরাতন রোগে পিপাসার অনুভূতি থাকে না।
- মারাত্মক দুর্বলতা এবং অবসাদ অনুভূত হয়, রোগটি মাঝরাত বা দুপুরের পর বাড়ে।
- সময়মতো রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়—এক দিন, দুই দিন, তিন দিন, এক সপ্তাহ বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর।
- শরীরের সব স্রাব অল্প, তরল, ক্ষয়কারী এবং পচা মাংসের মতো দুর্গন্ধযুক্ত।
আর্সেনিক এলবাম ঔষধের – মূলকথা
মন – তীব্র মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা এবং অস্থিরতা। রোগী সর্বদা স্থান পরিবর্তন করে, মৃত্যুভয় এবং একা থাকতে ভয় পায়। মারাত্মক ভীতি, ঠাণ্ডা ঘাম সহ একাকীত্বের অনুভূতি।
আত্মহত্যার ভ্রান্ত ধারণা থাকে। নিরাশা রোগীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। কৃপণতা, হিংসা, স্বার্থপরতা, উৎসাহ বা সাহসের অভাব। স্পর্শাধিক্য বৃদ্ধি (হাইপারথেসিয়া)। বিশৃঙ্খলা ও এলোমেলো অবস্থায় অস্থিরতা অনুভূত হয়।
মাথা – মাথার যন্ত্রণা ঠাণ্ডায় কমে, কিন্তু অন্য উপসর্গ ঠাণ্ডায় বাড়ে। নির্দিষ্ট সময়ে মাথায় জ্বালাকর যন্ত্রণা এবং অস্থিরতা থাকে।
মাথার চামড়ায় বরফের মতো ঠাণ্ডা অনুভূতি এবং প্রচণ্ড দুর্বলতা। মুক্ত বাতাসে মাথা খোলা রাখা সহ্য হয় না।
মাদকাসক্তদের মতো প্রলাপ বকা, অভিশাপ দেয় এবং ভুল বকে।
মাথার চামড়ায় অসহ্য চুলকানি, গোলাকার টাক, কর্কশ, মলিন এবং স্পর্শকাতর খুসকি থাকে। মাথার চামড়া অত্যধিক স্পর্শকাতর, চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে পারে না।
চোখ – চোখের ভিতর জ্বালা এবং চক্ষুস্রাব। চোখের পাতা লাল এবং ক্ষতযুক্ত। চোখের চারপাশে শোথ, বাইরের অংশে প্রদাহ, তীব্র বেদনা, জ্বালা এবং উত্তপ্ত অশ্রুস্রাব।
কর্ণিয়ায় ক্ষত। তীব্র আলোকাতঙ্ক, বাইরের গরমে উপশম বোধ করে। চোখের সিলিয়ারী পেশীতে স্নায়ুশূল ও জ্বালাকর যন্ত্রণা।
কান – কানের ভিতরের চামড়ায় জ্বালা এবং হজকরের অনুভূতি। পাতলা, হাজার এবং দূর্গন্ধযুক্ত পুঁজ। কানের যন্ত্রণার সময় কানে ঝনঝন শব্দ হয়।
নাক – পাতলা, জলীয়, হজকরের নাসিকা স্রাব। নাক বন্ধ মনে হয়। হাঁচির পর উপশম হয় না। হে-ফিভার ও সর্দি মুক্ত বাতাসে বৃদ্ধি পায়, ঘরের ভিতর উপশম হয়। জ্বালা এবং রক্তপাত। নাকের উপর ব্রণ এবং চারপাশে বিষাক্ত ক্ষত বিশেষ।
মুখমণ্ডল – স্ফীত, ফ্যাকাশে, হলুদ, রোগা মুখমণ্ডল। মুখ ভিতরের দিকে ঢোকা বা কোটরগত। মুখে যন্ত্রণার ছাপ, ছিড়ে ফেলার মতো বা সূঁচ ফোটানোর মতো যন্ত্রণা। ঠোঁট কালো ও ক্রুদ্ধ, গালের উপর গোলাকার উজ্জ্বল আভা।
মুখগহ্বর – মুখের ভিতর অস্বাস্থ্যকর, মাড়ী থেকে সহজেই রক্তপাত হয়। মুখে ক্ষত এবং শুষ্কতা, জ্বালাকর উষ্ণতা। ঠোঁটের উপর অর্বুদ বা এপিথিলেমিয়া।
জিহ্বা শুষ্ক, পরিষ্কার ও লাল, সূঁচ ফোটানোর মতো যন্ত্রণা, ক্ষতযুক্ত ও নীলচে। রক্তমিশ্রিত লালা। দাঁতগুলি আয়তনে বড় হয়ে যাচ্ছে এবং তীব্র টাটানি ব্যথা।
মুখের ভিতর ধাতব পদার্থের মতো আস্বাদ। মুখের ভিতর ওঠা জ্বালাকর জল রোগী ঢক করে গিলে ফেলে।
গলা – স্ফীত, শোথযুক্ত, সঙ্কুচিত, জ্বালা, গিলতে অক্ষম। ডিফথিরিয়া রোগের কৃত্রিম ঝিল্লী, দেখতে সুষ্ক ও কোঁচকানো।
পাকস্থলী – খাবারের দৃশ্য বা গন্ধ সহ্য করতে পারে না। প্রচুর পিপাসা, কিন্তু একসঙ্গে অল্প পরিমাণে জল পান করে। বমি বমি ভাব, বমি খাবার পরে বা কিছু পান করার পরে।
পাকস্থলীর উপরের অংশে উদ্বেগ এবং জ্বালাকর যন্ত্রণা। অম্ল ও কফি পানের প্রবল ইচ্ছা। মুখের ভিতর ভুক্ত খাদ্যের আস্বাদ টক ও তিতে। দীর্ঘস্থায়ী ঢেকুর তোলা।
রক্তবমন, পিত্তবমন, সবুজ শ্লেষ্মা বমন অথবা কালচে বাদামি বমি। পাকস্থলীর ভিতর ক্ষতের অনুভূতি। সামান্য খাদ্যে বা পানীয়ে পাকস্থলীর বেদনা।
ভিনিগার, অম্ল, আইসক্রিম, বরফ, জল, তামাক প্রভৃতির কুফলে অজীর্ণ। তীব্র ভীতি, শ্বাসকষ্ট এবং পাকস্থলীর বেদনা, মূর্চ্ছা এবং শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা।
উদর – দংশনবৎ, জ্বালাকর বেদনা, যেন পেটের ভিতর জ্বলন্ত কয়লা আছে। যকৃত ও প্লীহার বিবৃদ্ধি ও বেদনাযুক্ত। উদর স্ফীত ও বেদনাযুক্ত। কাশির সময় পেটের ভিতর বেদনা মনে হয় যেন পেটের ভিতর ঘা হয়েছে।
সরলান্ত্র – যন্ত্রণা, সরলান্ত্রের আক্ষেপিক নির্গমন। ভারীবোধ এবং জ্বালাকর যন্ত্রণা।
মল – অল্প দূর্গন্ধযুক্ত, কালচে, প্রচণ্ড দুর্বলতা। রাতের সময়, খাবার পরে ও পান করার পরে বৃদ্ধি। আমাশয়ে কালচে, রক্তযুক্ত এবং তীব্র দূর্গন্ধযুক্ত মল।
কলেরা, মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, দুর্বলতা এবং জ্বালাকর পিপাসা। সারা শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা। অর্শ, আগুনের মতো জ্বালা, গরম প্রলেপে আরাম।
প্রস্রাব – অল্প, জ্বালাকর, অসাড় প্রস্রাব। প্রস্রাবথলি যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন এবং এপিথিলিয়্যাল কোষ পাওয়া যায়। প্রস্রাব করার পরে পেটের ভিতর দুর্বলতা বোধ।
স্ত্রীরোগ – মাসিক ঋতুস্রাব প্রচুর এবং খুব শীঘ্র দেখা দেয়। ডিম্বাশয় স্থানে জ্বালা। প্রদর স্রাব, হাজাকর, জ্বালাকর, দুর্গন্ধযুক্ত এবং পাতলা।
গরমে বিদ্ধ করার মতো যন্ত্রণা, সামান্য পরিশ্রমে বৃদ্ধি, অত্যধিক অবসাদ। অতিরিক্ত। বস্তি কোটরে সূঁচ ফোটানোর অতিরিক্ত যন্ত্রণা উরু পর্যন্ত প্রসারিত হয়।
শ্বাস-প্রশ্বাস – শুয়ে থাকতে পারে না, শ্বাসবন্ধ হবার ভয়। বায়ু চলাচল পথের সংকীর্ণতা। হাঁপানী মধ্যরাত্রে বৃদ্ধি পায়। বুকের ভিতর জ্বালা। শ্বাস বন্ধকর সর্দি। কাশি মধ্যরাত্রির পর বৃদ্ধি পায়, চিৎ হয়ে শুলে বৃদ্ধি।
শ্লেষ্মা উঠানোর পরিমাণ অল্প এবং ফেনাযুক্ত। ডানদিকের ফুসফুসের উপরিভাগে তীরবিদ্ধ বেদনা। সাঁই-সাঁই শব্দযুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস।
কাশির সঙ্গে রক্ত ওঠে, দুই ঘাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বেদনা, জ্বালাকর উত্তাপ। শুষ্ক কাশি, গন্ধকের ধোঁয়া ফুসফুসে যাওয়ার পর কাশি হয়। পান করার পর কাশি।
হৃদপিণ্ড – হৃদকম্প, যন্ত্রণা, মূর্চ্ছা। ধূমপানকারী বা তামাক পাতা চিবানো ব্যক্তিদের উত্তেজিত হৃদপিণ্ড। সকালের দিকে নাড়ী অত্যন্ত দ্রুত।
হৃদপিণ্ডের বিবৃদ্ধি। শরীর লালচে বর্ণের। হৃদপিণ্ডে মেদ সঞ্চয়ের কারণে অসুস্থতা। অ্যানজাইনা পেক্টোরিস বা হৃদশূল, ঘাড় ও মাথার পিছনের দিকে বেদনা।
পিঠ – পিঠের ছোট অংশে দুর্বলতা। কাঁধ দুই দিকে টেনে সেঁটে থাকে, পিঠে যন্ত্রণা এবং জ্বালা।
অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ: শরীরের বিভিন্ন অংশে কম্পন ও অস্বস্তি। শরীরের অংশ বিশেষে দুর্বলতা এবং ভারী অনুভূতি। পায়ে তীব্র যন্ত্রণা, বিশেষ করে নিম্নাঙ্গে।
ডায়াবেটিস সম্পর্কিত গ্যাংগ্রীন। গোড়ালিতে সিপা বা ল্যামিয়াম দ্বারা ক্ষত। পা বা নিম্নাঙ্গের পক্ষাঘাত।
চামড়া: চামড়ায় চুলকানি এবং জ্বালাকর অনুভূতি। চামড়ায় ফুসকুড়ি এবং শুষ্কতা।
চামড়ায় বিষাক্ত পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি। সোরিয়াসিসের লক্ষণ এবং চামড়ার অবস্থা।
ঘুম: ঘুমের মধ্যে অস্থিরতা এবং আতঙ্ক। ঘুমানোর সময় মাথা উঁচু করে রাখতে বাধ্য হওয়া। ঘুমের সমস্যায় ভোগা।
জ্বর: প্রচণ্ড উত্তাপ ও জ্বর। সেপটিক বা বিষাক্ত জ্বর। মাঝরাতে জ্বর বৃদ্ধি।
কমা–বাড়া: ঠাণ্ডা ও ভিজে আবহাওয়া থেকে অসুবিধা। ডান দিকের শরীরের অংশে সমস্যা।
উপশম: গরম পানীয় ও গরম আবহাওয়ায় উপশম।
অনুপূরক ঔষধ: রাস, কার্বা, ফস, থুজা
শক্তি: ৩য় থেকে ৩০ শক্তি
বিঃ দ্রঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।
( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )