Breaking News

বেলাডোনা

Belladona (বেলাডোনা)

অপর নাম— অ্যাট্রোপা বেলাডোনা (Atropa Belladonna)

ডেডলি নাইটশেড (Deadly Nightshade)

সোলানেসি পরিবারের অ্যাট্রোপা বেলাডোনা গাছ থেকে এই ঔষধ প্রস্তুত করা হয়। স্পেনের মেয়েরা মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এবং চোখের উজ্জ্বলতা বাড়ানোর জন্য এটি ব্যবহার করে থাকে।

বেলাডোনা স্নায়ুতন্ত্রের সমস্ত অংশের ওপর প্রভাব ফেলে, যা সক্রিয় রক্তাধিক্য বা প্রচুর রক্ত সঞ্চয়, তীব্র উত্তেজনা, বিশেষভাবে চিহ্নিত ইন্দ্রিয়গুলির বিকৃত কার্য, নাচ, আক্ষেপ ও যন্ত্রণা সৃষ্টি করে।

এই ঔষধটির রক্তবহনলীতন্ত্র, চামড়া ও গ্রন্থির ওপর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।

বেলাডোনার সঙ্গে সাধারণত যে লক্ষণগুলি থাকে, তা হল উত্তপ্ত, লালচে চামড়া, উজ্জ্বল চোখ, মুখমণ্ডলের লালত্ব, দুই পাশের রগের ধমনীতে দপদপানি, উত্তেজিত মানসিক অবস্থা, অতীত অনুভূতিশীল ইন্দ্রিয়, প্রলাপবাকতা ।

অস্থির নিদ্রা, আক্ষেপিক নড়াচড়া, মুখ ও গলার শুষ্কতা এবং জলপান না করার প্রবণতা, স্নায়বিক বেদনা যা হঠাৎ আসে ও চলে যায়, উত্তাপ, লালবর্ণ ও জ্বালা।

শিশুদের জন্য এটি একটি কার্যকরী ঔষধ। মৃগীর আক্ষেপের পর বমি বমি ভাব ও বমি হলে এটি ব্যবহৃত হয়।

স্কারলেট জ্বর বা লাল জ্বরে এটি একটি প্রতিষেধক। এই ক্ষেত্রে ৩০ শক্তি ব্যবহার করা হয়। গলগণ্ড রোগে যখন চোখের তারা বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে, তখনও এটি ব্যবহৃত হয়।

বিমান চালক বা বিমানের যাত্রীদের বিমানে চড়ার পর যে জাতীয় অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তা বেলাডোনার লক্ষণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে এই ঔষধটি প্রতিষেধক হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তৃষ্ণাহীনতা অথবা ভয়ের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।

বেলাডোনার বৈশিষ্ট্য হল হঠাৎ করে রোগাক্রমণ ও তীব্র রোগের সূচনা। গলগ্রন্থির হরমোন বিষক্রিয়ার কারণে, বেলাডোনা ১x বিচূর্ণ ব্যবহার করা হয়।

বেলাডোনা ঔষধের চরিত্রগত লক্ষণ:

  • আক্রান্ত অংশে উত্তাপ, লালবর্ণ (আরক্তিম) ও জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।
  • মস্তকে রক্তাধিক্য দেখা দেয়, মাথা গরম থাকলেও হাত-পা ঠান্ডা থাকে।
  •  তীব্র লোগের অবস্থায় মুখমণ্ডল লালবর্ণ ও ফোলা হয়ে যায়, ক্যালোটিড ধমনীর দপদপানি ও মাথা ব্যথা ঘটে।
  •  তরুণ বয়সে এসব লক্ষণ সাধারণত দেখা যায়।
  • তরুণ ব্যক্তিরা হঠাৎ প্রচণ্ড আক্রমণের শিকার হন, এবং বেদনা হঠাৎ শুরু হয়ে আবার হঠাৎ উপশম হয়।
  • সামান্য ঝাঁকুনি, নড়াচড়া বা ঠান্ডায় বেদনা বৃদ্ধি পায়।
  • রোগী ঘুমের মধ্যে বা অনেক সময় জাগ্রত অবস্থায়ও চমকে ওঠে।
  • শিশু হঠাৎ জেগে কিছু ধরার জন্য হাত বাড়ায়, কাঁপতে থাকে, এবং মনে হয় যেন ভয় পেয়েছে।

বেলাডোনা ঔষধের – মূলকথা:

মনবেলাডোনা রোগীরা একটি স্বপ্নময় ও বাস্তব-বর্জিত জগতে বিচরণ করে, যেখানে ভূতপ্রেতের মত কল্পনাময় অবস্থার দেখা পাওয়া যায়। যদিও রোগী প্রকৃত বস্তু সম্পর্কে অনুভূতিহীন, তাদের চারপাশে দৃষ্টিবিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যা মূলত তাদের অন্তর থেকে উদ্ভূত। কেবলমাত্র রোগী নিজে এই ধরনের বিভ্রান্তি ও কাল্পনিক বস্তু অনুভব করতে পারে।

দৃষ্টির বিভ্রান্তি, দৈত্যদানব বা বিকট মুখের দৃশ্য, প্রলাপ বকা, ভয়ঙ্কর মূর্তি, উন্মত্ততা, রাগ, চিৎকার করা, কামড়ানো, আঘাত করা এবং পলায়ন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। রোগীর মানসিক অবস্থার একটানা পরিবর্তন ও অনুভূতির তীক্ষ্ণতা দেখা যায়।

 

মাথামাথার ভিতর তীব্র দপদপানি ও উত্তাপ অনুভূত হয়। মাথা গরম, কিন্তু হাত-পা ঠান্ডা থাকে।

মাথার পেছনে ও রগের দিকে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। সর্দি স্রাবের ফলে মাথাব্যথা হঠাৎ করে চিৎকার করে ওঠে। আলো, শব্দ, ঝাঁকুনি, শুয়ে থাকা ও বিকেলের দিকে মাথাব্যথা বৃদ্ধি পায়, চাপ দিলে ও হেলান দিলে উপশম হতে পারে।

রোগী ঘুমের মধ্যে অথবা জাগ্রত অবস্থায়ও চমকে ওঠে, মাথা পিছনে ঝুঁকে রাখে এবং বালিশে একদিক থেকে অপরদিকে চালাতে থাকে।

 

মুখমণ্ডল: মুখমণ্ডল লাল, নীলচে-লাল, উত্তপ্ত ও স্ফীত থাকে। মুখমণ্ডলের পেশীর অস্থির নড়াচড়া, উপরের ঠোঁটের স্ফীতি, এবং স্নায়ুশূল পেশীর স্পন্দন লক্ষ্য করা যায়। মুখমণ্ডল রক্তিম ও চকচকে।

চোখশুয়ে পড়ার পর চোখের গভীরে দপ্ কর বেদনা হয়। চোখের তারা বিস্ফারিত ও বাইরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আসে। স্থির দৃষ্টি, কনের্জাংটিভার লাল, শুষ্ক, জ্বালাকর।

চোখের ভিতরে তীর বিদ্ধের মত ব্যথা অনুভূত হয়। দৃষ্টি বিভ্রান্তি, আগুনের মত দৃষ্টি, এবং চোখের পাতার স্ফীতি দেখা যায়।

 

কানমধ্য ও বহিঃকর্ণে ছিঁড়ে ফেলার মত ব্যথা। কানের ভিতর শব্দ এবং কানের পর্দার বাইরের দিকে স্ফীতি। কর্ণমূল গ্রন্থির স্ফীতি। শিশু ঘুমের মধ্যে কাঁদে, কানের ভিতরে দপদপকর ও আঘাতের মত ব্যথা অনুভূত হয়। কানের ভিতর রক্তার্বূদ এবং কর্ণনলীর প্রদাহ দেখা যায়।

 

নাককাল্পনিক গন্ধ পাওয়া যায়। নাকের অগ্রভাগে সুড়সুড়ি অনুভূত হয়। নাক লাল ও স্ফীত, এবং রক্তস্রাব হয়। সর্দি, রক্তমিশ্রিত শ্লেষ্মা।

মুখগহ্বর: মুখগহ্বর শুষ্ক, দাঁতে দপদপকর ব্যথা। মাড়ীতে ফোঁড়া, জিহ্বার ধার লাল বর্ণযুক্ত। জিহ্বা স্ট্যাবরি বা রসাল ফলের মত দেখায়। দাঁত কড়মড় করে, জিহ্বা স্ফীত ও বেদনা যুক্ত।

গলা: গলা শুষ্ক, চকচকে, রক্তাধিক্যপূর্ণ, লালবর্ণযুক্ত। টনসিলের বিবৃদ্ধি, গলার ভিতরে সংকীর্ণতা, ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। তরল বস্তু পানে অস্বস্তি ও গলার ভিতরে মণ্ডের ন্যায় কিছু থাকার অনুভূতি।

পাকস্থলী: ক্ষুধার অভাব, দুধ ও মাংসে অনিচ্ছা। পেটের উপরের অংশে আক্ষেপিক ব্যথা। বমি বমি ভাব ও বমি, ঠাণ্ডা। জল পানের তীব্র পিপাসা ও পাকস্থলীর আক্ষেপ।

উদর: উদর স্ফীত, উত্তপ্ত, এবং স্পর্শকাতর। পেটে আড়াআড়ি ভাবে কেটে ফেলার মত ব্যথা। পেটের বাম দিকে সূঁচ ফোটার মত ব্যথা।

মল: পাতলা, সবুজবর্ণের, আমাশয়ের মত মল। মলত্যাগের সময় কাঁপুনি, সরলান্ত্রে হুল ফোটার মত ব্যথা, আক্ষেপিক সংকীর্ণতা।

প্রস্রাব: মূত্ররোধ, প্রস্রাবের সময় ক্রিমির মত অনুভূতি। প্রস্রাব কম, কালচে ও ঘোলাটে। প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা এবং প্রস্টেট গ্রন্থির বিবৃদ্ধি।

পুরুষের রোগ: অণ্ডদ্বয় শক্ত, প্রদাহযুক্ত। যৌনাঙ্গে রাত্রিকালীন ঘাম ও প্রস্টেট গ্রন্থি থেকে তরল পদার্থের নিঃসরণ। কামেচ্ছা কমে যায়।

স্ত্রীরোগ: যোনিনলী শুষ্ক ও উত্তপ্ত, কোমরের চারপাশে টেনে ধরার মত অনুভূতি। ধাতুস্রাব বৃদ্ধি পায়, উজ্জ্বল লাল এবং প্রচুর পরিমাণে। স্তনে ভারবোধ, প্রদাহ ও স্ফীতি।

শ্বাসপ্রশ্বাস: নাক, গলা ও শ্বাসনালীর শুষ্কতা। ছোট ছোট, শুষ্ক কাশি, রাত্রে বৃদ্ধি। কণ্ঠনলীতে টাটানি এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বুকের ভিতরে চাপবোধ।

হৃদপিণ্ড: তীব্র হৃদকম্প, মাথার ভিতরে প্রতিধ্বনি হয়। সামান্য পরিশ্রমে হৃদকম্প এবং সারা শরীরে দপদপকর অনুভূতি।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গঅঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তীর বেঁধার মত ব্যথা। সন্ধিস্থান স্ফীত, লালচে ও চকচকে। বাতের পরিবর্তনশীল ব্যথা, ফিনোর‌্যাল শিরার প্রদাহ ও পায়ের স্ফীতি।

পিঠ: গ্রীবাস্থান আড়ষ্ট, ঘাড়ের গ্রন্থির স্ফীতি। পিঠে চাপযুক্ত তীব্র ব্যথা এবং কোমরের বেদনা।

চামড়া: শুষ্ক, উত্তপ্ত, স্ফীত, জ্বালাকর, রক্তবর্ণ, মসৃন। স্কারলেট জ্বরের মত উদ্ভেদ, মুখমণ্ডলে পুঁজযুক্ত ফুস্কুড়ি।

জ্বর: তীব্র জ্বর, তুলনামূলকভাবে রক্তে বিষদুষ্টির অভাব। তৃষ্ণাহীন, ঝাঁঝাঁল উত্তাপ, পা বরফের মত ঠাণ্ডা।

ঘুম: অস্থির, চিৎকার করে ওঠা, দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ। নিদ্রাহীনতা, ঝিঁমুনি। মাথার নিচে হাত রেখে ঘুমানো।

কমাবাড়া: বৃদ্ধি, স্পর্শ, ঝাঁকুনি, শব্দ, বায়ুপ্রবাহ, বিকালে, শুয়ে পড়লে।

উপশম: হেলান দেওয়া অবস্থায় থাকা।

সম্বন্ধ:

  • তুলনীয়: স্যাঙ্গুনারিয়া আফিসিন্যালিস ২x – ৬x, ম্যানড্র্যাগেরা, হায়োসায়োমাস, স্ট্রামোনিয়াম, হোয়িটজিয়া।
  • পরিপূরক: ক্যালেরিয়া, বিশেষ করে আধা-পুরাতন ও ধাতুগত রোগে।
  • প্রতিবন্ধক: এসেটিক অ্যাসিড।

শক্তি: ১ম থেকে ৩০ শক্তি এবং উচ্চতর শক্তি। তরুণ রোগে বারবার প্রয়োগ করা হয়।

বিঃ দ্রঃ  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য  হোমিও চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ সেবন করুন।

( হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বই মেটেরিয়া মেডিকা হতে প্রকাশিত )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-7254298778630529"
     crossorigin="anonymous"></script>